একটি ভ্রুণ, অতঃপর একজন মায়ের যুদ্ধ

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

সারা রাত চোখ দুটির ওপর দিয়ে বেশ ধকল গেছে তা অরণ্যার দিকে তাকালে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়ে ধরা দেয়। এক রাতেই চোখের নীচে কালশীটে দাগ পড়ে গেছে। ফুলে ঢুল হয়ে গেছে চোখের পাতা দুটি। মুখের বিভিন্ন স্থানে কান্নার ছোপ ছোপ দাগ। মাথার চারপাশে অগুছালো চুল ছড়িয়ে আছে। কাল বিকেলেও এমনটি ছিলনা। অথচ আজ মনে হচ্ছে, দেবী প্রতিমার স্নিগ্ধ অবয়বে কে যেন বিষাদের কালো কালি মেখে দিয়েছে।
গতকাল বিকেল থেকেই বারবার অরণ্যার গা গুলাচ্ছিলো। মাথা ঝিম ঝিম করছিলো। তীক্ষ্ণ ধাতব আওয়াজ যেমন কানের ভিতর আঘাত হানে, মাথার মধ্যে ঠিক তেমনটি করছিলো। বিকেলে দু-বার প্রায় বমি হতে গিয়েও হয়নি। সন্ধ্যা নামতেই বার কয়েক বমি হলো। বমির তীব্র গতিবেগে মনে হচ্ছিলো পেটের সমস্ত নাড়িভূড়ি বুঝি ছিড়ে যাবে। তবে বমি হওয়াতে শরীর বেশ হালকা হয়েছিল। হঠাত করে শরীরের এমন আচরণে সে নিজেই বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলো। কোন পূর্বাভাস ছাড়াই যেন এক মহা প্রলয় বয়ে গেল।
মহা প্রলয় থামতেই সে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। চোখ সামান্য বুজে আসতেই মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো। চোখ মেলে দেখল, জেসমিন বেশ কঠিন মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। রাগে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে। মুখের নীলাভ শিরাগুলো যেন ফর্সা চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তিনি চেহারার ন্যায় বজ্র-কঠিন কন্ঠে বললেন, ‘অরণ্যা, তুমি উঠে বস। তোমার সাথে দুটো কথা আছে।’
অরণ্যা এর আগে মায়ের এমন কঠিন রূপ দেখেনি। চিরকালের স্নিগ্ধ, কোমল মায়ের এ রকম আচরণে সে আশ্চর্য্য হল, সেই সাথে ভয় ভয় লাগল। সে কী নিজের অজান্তে কোন অন্যায় করে ফেলেছে? না, শত চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না কোন অন্যায় করেছে কিনা! সে ভয়ে ভয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বসতে চাইল কিন্ত ঠিকমতো বসতে পারলনা। একটু আগে বয়ে যাওয়া ঝড়ে শরীরটা নিস্তেজ হয়ে গেছে। শরীরের শেষ শক্তিকণাগুলো যেন উদ্বায়ী পদার্থের ন্যায় সরাসরি বাতাসের সাথে মিশে গেছে। কোন রকমে হেলান দিয়ে বসতেই জেসমিন বললেন, ‘তোমাকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করবো, তুমি সাফ সাফ জবাব দিবে।’
অরণ্যা এখনও কিছু বুঝতে পারছেনা। সে ভয়ে ভয়ে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
মা মুখটা সামান্য গম্ভীর করে বললেন, ‘তোমার কী হয়েছে? আমাকে খুলে বলো।’
অরণ্যার বুক থেকে একটা চাপা আতংক দীর্ঘশ্বাসের সাথে স্বস্তি হয়ে বেরিয়ে এলো। এই কথা জিজ্ঞেস করার জন্য এতো কঠিন হওয়ার কি কোন কারণ হয়! সে মুখে সামান্য হাসি এনে বললো, ‘এই কথা! বাইরে চটপটি আর ফুচকা খেয়েছিলাম হয়তো সে কারণেই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হচ্ছে। এ নিয়ে তুমি কোন চিন্তা করোনা মা। এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।’
জেসমিন কন্ঠ আরেকটু উচু করে বললেন, ‘হেয়ালী ছাড়ো। সত্যি করে বলো তোমার সমস্যা কি? আমি অন্য কিছুর আভাস পাচ্ছি।’
এবার অরণ্যার মেজাজ সত্যি বিগড়ে গেলো, সেও খানিকটা উচু স্বরে বলল, ‘কি হয়েছে তোমার! বলছি সামান্য গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, তা নিয়ে এতো মাথা ঘামানোর কোন কারণ আমি দেখছিনা।’
জেসমিনের গলাটা যেন একটু ধরে এলো। তবুও আগের সেই তীব্রতা বজায় রেখে ধরা গলাতেই বললেন, ‘তুমি কিছু লুকোনোর চেষ্টা করোনা। আমি যা ধারণা করছি তা সত্যি হলে সমাজে আর মুখ দেখানো যাবেনা।’
অরণ্যা যেন আকাশ থেকে পড়ল। এসব কথার মানে কি! সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সরাসরি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আশ্চর্য্য! তুমি কি বলতে চাইছো একটু পরিষ্কার করে বল তো।’
জেসমিন ইতস্তত করে সরাসরি বললেন, ‘আমার ধারণা তুমি প্রেগনেন্ট।’
যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটল। এক ধারালো কুঠার দিয়ে কেউ যেন অরণ্যার মাথা দ্বিখন্ডিত করে ফেলেছে। সে রাগে ফুসতে ফুসতে বলল, ‘ছি মা! ছি! তোমার চিন্তা-ভাবনা এতো নীচ! নিজের মেয়েকে তুমি এমন কথা বলতে পারলে! আমার ঘেন্না হচ্ছে।’
জেসমিন বললেন, ‘ঘেন্না তো হওয়ার কথা আমার। তোমার মতো মেয়ে পেটে ধরেছি বলে লাজে আমার মাথা হেট হয়ে যাচ্ছে।’
অরণ্যা অশ্রু সজল চোখে বলল, ‘মা! প্লীজ তুমি থাম। এভাবে অন্যায় অপবাদ তুমি আমাকে দিওনা। তোমার কেন মনে হচ্ছে আমি প্রেগনেন্ট?’
জেসমিন কিছুক্ষণ মৌন হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘তোমার শারীরিক লক্ষণই বলে দিচ্ছে তুমি কনসিভ করেছো। কয়েকদিন আগেই তুমি আমাকে জানিয়েছো তোমার পিরিয়ডে সমস্যা হচ্ছে। আর এর মাঝে তোমার এমন গা গুলানো ভাব, বমি বমি ভাব, শারিরীক অবসাদ স্পষ্টত সেটাই প্রমাণ করে।’
অরণ্যা ততোক্ষণে পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে গেছে। সে আমতা আমতা করে বলল, ‘এসব তো খুব স্বাভাবিক মেয়েলী সমস্যা। তাই বলে এ নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবার মানেটা কি? তাছাড়া বিশ্বাস করো, আমি কোন পাপ কাজ করিনি।’
জেসমিন বললেন, ‘দেখ অরণ্যা, আমি নিজে একজন নারী। নারীত্বের এরকম কিছু মূহুর্ত্ব আমিও অতিক্রম করে এসেছি। একজন নারীর নিকট এ ব্যাপারগুলো লুকানোর কোন উপায় নেই।’
অরণ্যা বলে, ‘মা তুমি আমার ওপর বিশ্বাস রাখ।’
‘আমি তোমার ওপর বিশ্বাস রাখতে চাই। আমার অনুমান মিথ্যে হলে আমার চেয়ে খুশী আর কেউ হবেনা।’ রুক্ষ্ণস্বরে জেসমিন কথাগুলো বলেন।

অরণ্যা কোন কথা খুঁজে পায়না। লজ্জ্বায় তার মাথা নিচু হয়ে আসে। মায়ের দিকে তাঁকাতে সাহস হয়না। অশ্রুসিক্ত চোখ বন্ধ করতেই অক্ষিপটে ভেসে ওঠে একটা ডিঙ্গি নৌকা। নতুন বাঁশ দিয়ে ডিঙ্গিটার ছই ছাওয়া। সেই নৌকার একপাশের গলুইয়ে বসে আছে এক জোড়া যুবক-যুবতী। ছোট্ট ডিঙ্গিটা শ্রাবণের প্রবল স্রোতে আপন গতিতে ঠিকানাবিহীন ছুটে চলেছে। যুবক-যুবতীর সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। যুবকের ভরাট কন্ঠ রবি ঠাকুরের কোন এক রোমান্টিক কবিতা আউরাচ্ছে। আর যুবতী মুগ্ধ হয়ে সেই ভরাট কন্ঠের মাধুর্য্য শ্রবণ করছে আর মাঝে মাঝে নদীর স্বচ্ছ নীলাভ জল যুবকের দিকে ছিটিয়ে দিচ্ছে। যুবক এ দুষ্টুমি বেশ উপভোগ করছে।
হঠাত করে আকাশ বেয়ে নেমে এলো বারিধারা। বৃষ্টির পরশ পেয়ে যুবতী যেন নতুন আনন্দে জেগে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে, বিস্তৃত দিগন্তের দিকে দু-হাত প্রসারিত করে বৃষ্টির শীতল পরশ নিতে লাগল। যুবতীর বৃষ্টিবিলাস যুবক মুগ্ধ নয়নে অবলোকন করছে। ক্রমে বৃষ্টির বেগ বাড়তেই যুবক-যুবতী ছইয়ের তলায় আশ্রয় নিলো। বৃষ্টিসিক্ত বসন যুবতীর দেহকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রেখেছে। যুবতীর মুখখানা লজ্জ্বায় কুঁকড়ে আসছিল। সে দু-হাত বুকের কাছে আড়াআড়ি করে নিজেকে আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করল। তারপর গুটিসুটি মেরে আড়ষ্টতার সাথে বসে রইল।
যুবতীর গোলাপী ওষ্ঠে বিন্দু বিন্দু জলকণা চিকচিক করছে। কম্পমান ওষ্ঠদ্বয় যেন একটুখানি উষ্ণতার অপেক্ষায় রত। যেন সামান্য উষ্ণতা পেলেই যুবতীর সকল আড়ষ্টতা কেটে যাবে। যুবক এতোক্ষণ চুপচাপ যুবতীকে দেখছিল। কিন্ত যুবতীর ঠোটের ওপর দীপ্যমান মুক্তোদানার ঔজ্জ্বল্যে সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল। যুবতীকে কোন কিছু ভাবার সুযোগ না দিয়েই যুবক নিজের খয়েরী অধরে জড়িয়ে নিলো যুবতীর সিক্ত অধর। ঘটনার আকষ্মিকতায় যুবতী বিষ্মিত হয়। কিন্ত সেই বিষ্ময় বেশীক্ষণ স্থায়ী হয়না। যুবকের অবিরাম চুম্বনে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। যুবকের কঠিন অথচ ভালোবাসাময় বেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়ে একে-অপরের সাথে লতায়পাতায় মিশে যায়। এ যেন শরীরের সাথে শরীরের; হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের; এক গভীর আত্মিক বন্ধন।
ঘোর যখন কাটলো তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় যুবতী স্তম্ভিত হয়ে গেল। লজ্জ্বা-ঘৃনা-ভয় ধারালো ছুরির ন্যায় যুবতীর অন্তরে আঁচড় কাটতে লাগল। নৌকার পাটাতনে মুখ লুকিয়ে যুবতী সব লজ্জ্বা ঢাকার চেষ্টা করল। আর পাটাতনের ফাঁক বেয়ে যুবতীর খানিকটা অশ্রু নদীর জলে গিয়ে মিশল। যুবক পাটাতন থেকে যুবতীর মুখ তুলে আনলো। যুবতীর চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, ‘কাঁদছো কেন লক্ষীটি? আমরা কোন অন্যায় করিনি।’
যুবতী তখনও লজ্জ্বা কাটিয়ে উঠতে পারেনা। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে, ‘এ কী অন্যায় নয়? একটু নিশ্বাস নিয়ে আবার বলে, আমার ভীষণ ভয় করছে।’
যুবক সে রকমই শান্ত স্বরে বলে, ‘না অন্যায় নয়। আমরা একে-অপরকে ভালোবাসি। সে ভালোবাসার দোহাই দিয়ে বলছি তুমি নির্ভয় থাকো।’ যুবতী কোন কথা খুঁজে পায়না। সে যুবকের বুকের আড়ালে নিজের মুখ লুকায়।
আর কিছু ভাবতে পারেনা অরণ্যা। অশ্রুজলে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে অরণ্যা শিউরে উঠল। একরাতেই চেহারাটা এমন বিধ্বস্ত হয়ে গেছে ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। যদি ঘটনা সত্যি হয়! অরণ্যা আর ভাবতে পারেনা। সে এলো চুলগুলো কোন রকমে কানের পেছনে সামলে স্বপ্নীলকে ফোন দিলো। ওপর পাশ থেকে স্বপ্নীলের ভরাট গলা ভেসে আসতেই সে নিজের মনোবল যেন খানিকটা ফিরে পেল। এ ভরাট কন্ঠের যাদুতেই সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভালোবাসার তরীতে স্বপ্নচারী হয়ে ভাসার সাহস পেয়েছে। এই সুলায়লিত কন্ঠের আহবানে সাড়া দিতে গিয়েই আজ সে কলংকিনী হওয়ার পথে। তবুও এই কন্ঠের ওপর রাগ করতে পারেনা। এ কন্ঠ শুনলেই যেন সমস্ত ভয় কেটে যায়, সামনে ভেসে ওঠে নির্ভরতায় ভরপুর একখানা শান্ত মুখ। চিরচেনা কন্ঠের উত্তর দিতে গিয়েই দেখল লাইন কেটে গেছে।

মেডিক্যাল রিপোর্ট হাতে আসতে বিকেল হয়ে গেল। শেষ বিকেলের রোদ ডায়গনস্টিক সেন্টারের গ্লাসে বিচ্ছুরিত হয়ে অরণ্যার চোখে এসে পড়ছে। রোদের সোনালী আলো অরণ্যার মুখে পড়ে চেহারার ম্লান ভাব আরো ফুটিয়ে তুলছে। অরণ্যার মা জেসমিন এক পাশের সোফায় বসে গম্ভীর দৃষ্টিতে সিসিটিভির দিকে তাকিয়ে আছেন। রিসিপশনে রিপোর্ট নেয়ার জন্য ডাক দিতেই তিনি এগিয়ে গেলেন। পুরো রিপোর্ট দেখার পর সে জায়গাতেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মুখটা আরো গম্ভীর হয়ে ওঠলো। অরণ্যা জেসমিনের পেছনে এসে দাঁড়ালো। মৃদু কন্ঠে ডাক দিল, মা।
জেসমিন পেছন ফিরলেন। অরণ্যার দিকে রিপোর্ট এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দেখলে তো আমি যা আন্দাজ করেছিলাম তাই সত্যি হল।’
অরণ্যা স্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর আর কোন কিছু বলার মুখ রইলনা। বারবার নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর জেসমিন বললেন, ‘আমরা তোমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি তোমার নিজের ভালোমন্দ বুঝতে শিখেছ। কিন্ত এখন দেখছি আমাদের ধারণা পুরোপুরি ভূল। আমাদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তুমি যা করেছ তাতে সমাজে মান-সম্মান বলে আর কিছু রইলনা। আমি তোমার বাবাকে কি জবাব দেব!’ কথাগুলো শেষ করে জেসমিন চশমা খুললেন। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল আড়াল করতে চাইলেন।
কিছুক্ষণ থেমে বললেন, ‘এখন তোমার সামনে একটা পথই খোলা আছে।’
অরণ্যা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁকায়। তিনি বলেন, ‘তোমার এ ব্যাপারটা তুমি আর আমি ছাড়া এখন পর্যন্ত আর কেউ জানেনা। তোমার গর্ভের সন্তানকে গর্ভেই নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তাহলে বাইরের কাক-পক্ষীও টের পাবেনা; আর সমাজে আমাদের সম্মানটাও বজায় থাকবে। আমি কথা দিচ্ছি তোমার বাবাও ঘুণাক্ষরে কিছু জানতে পারবেনা।’

গর্ভের সন্তান গর্ভেই নষ্ট করে দেওয়া কথাটা অরণ্যার কানে প্রবল আঘাত হানল। তার মনে প্রবল পাপবোধের সৃষ্টি হল। স্বপ্নীলের সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে সে পাপ করেছে সত্যি কিন্ত ভ্রুণহত্যার মতো নির্মম ও ঘৃণ্য পাপ সে কখনও করতে পারবেনা। ভ্রুণহত্যা যে জগতের সকল পাপ, সকল অন্যায়কে ছাড়িয়ে যায়। এক জোড়া নারী-পুরুষের মূহুর্ত্বের ভূলের জন্য একটি পবিত্র জীবনকে অংকুরেই বিনষ্ট করে দেওয়াকে অরণ্যা মন থেকে মানতে পারলনা। কিন্ত সে এতোটাই হতাশ ও বিধ্বস্ত যে মায়ের এ কথার কোন উত্তর দিতে পারলনা। সে কান্নাভেজা কন্ঠে, ‘আমাকে ভাববার সময় দাও মা।’ বলেই ছুটে বেরিয়ে গেল।

ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে অরণ্যা ও স্বপ্নীল বসে আছে। অরণ্যা মাথা নিচু করে মৌন হয়ে রয়েছে। স্বপ্নীল অরণ্যাকে গালে আলতো ঠোকা দিয়ে সেই যাদুময় কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হয়েছে মাই ডিয়ার প্রিন্সেস? এতো জরুরী তলব দিয়ে আনালেন আর এখন আপনি চুপ করে আছেন! এ অধম বান্দা কি কোন গুরুতর কসুর করে ফেলেছে?’
স্বপ্নীলের এ ধরণের তামাশা অরণ্যার ভালো লাগছেনা। সে টেবিল থেকে মাথা তুলে বলল, ‘তোমার সাথে কিছু সিরিয়াস কথা আছে।’
স্বপ্নীল আগের মতোই হেয়ালী করে বলল, ‘কি ব্যাপার, বাসায় বিয়ের আলাপ চলছে নাকি?’
অরণ্যা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলনা। দুচোখ কান্নায় ভরে ওঠল। স্বপ্নীল অবাক হল। সে কিছু বলার আগেই অরণ্যা বলল, ‘আমি মা হতে চলেছি।’
স্বপ্নীলের কানে যেন বোমা পড়ল। সে চেহারায় বিষ্ময় ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী?
অরণ্যা মাথা নিচু করেই বলল, ‘আই এম জাস্ট প্রেগনেন্ট।’
স্বপ্নীল চোখ বিস্ফোরিত হল। ‘ইটস ইম্পসিবল। আই কুড নট বিলিভ মাই ইয়ারস!’
অরণ্যা এবার সরাসরি স্বপ্নীলের দিকে তাকাল। স্বপ্নীলের চোখগুলো বিস্ফোরিত। চেহারায় উতকন্ঠার ছাপ। অরণ্যা নিজেকে সামলে বলল, ‘বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে কেন!’
স্বপ্নীল বলল, ‘এটা কীভাবে সম্ভব?’
অরণ্যা তাচ্ছ্বিল্যভরে বলল, ‘সেদিন বিকেলের কথা কি ভুলে গেছ?’
স্বপ্নীলকে এবার সত্যি বিধ্বস্ত দেখায়। সে দু-হাতে মাথার চুল টানতে থাকে। অনেকক্ষণ পরে বলে, ‘দেখ অরণ্যা, আমি কিছু চিন্তা করতে পারছিনা। আমার সবকিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। তুমি আমাকে কি করতে বলো?’
অরণ্যা সাথে সাথেই জবাব দিলো, ‘এর একটাই সমাধান, আর সেটা বিয়ে।’
স্বপ্নীল ভূত দেখার মতো চমকে উঠল, ‘বিয়ে! অসম্ভব।’
অরণ্যার ঠোটের কোণে বিদ্রুপের হাসি ফুটে ওঠল। ‘বাহ! দারুন! বিয়ের কথা বলতেই মাথায় যেন বাজ পড়ল!’
‘আমাকে বুঝতে চেষ্টা করো অরণ্যা।’
‘আর বুঝাবুঝির কি আছে। অন্যায় আমরা দু-জনে করেছি, তাহলে কলংকের ভাগীদার আমি একা হবো কেন?’
‘আমি স্বীকার করছি দোষটা আমারই বেশী। কিন্ত এ মূহুর্ত্বে বিয়ে করার মতো কোন মানসিকতা আমার নেই।’
‘মানসিকতা নেই কেন?’
‘তুমি বুঝতে চেষ্টা কর। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লীট হতে এখনও বছর দেড় বাকি। এখন তোমাকে বিয়ে করে আমি খাওয়াব কি?’
‘আমরা দু-জন মিলে যেকোন ভাবে সব চালিয়ে নেব। তুমি না বললে গলায় দড়ি দেয়া ছাড়া আমার কোন উপায় থাকবেনা।’ কথাগুলো শেষ করেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে অরণ্যা।
‘বি প্র্যাকটিক্যাল অরণ্যা। আমি কোনভাবেই এখন বিয়ে করতে পারবনা। ক্যারিয়ার বিল্ড-আপ হওয়ার আগেই বিয়ের মতো গুরু দায়িত্ব নেয়ার জন্য আমি কোনভাবেই প্রস্তুত নই।’
‘বাহ! তাহলে তোমার রোপনকৃত পাপের বীজ কি আমাকে একাই বয়ে বেড়াতে বল?’
‘আমি সে কথা বলছিনা। বিয়ে না করেও আমরা এ সমস্যার সমাধান করতে পারি। তুমি এখনও প্রাইমারী স্টেইজে আছো। এখনই এবরশন করিয়ে নিলে কোন ঝুঁকি থাকবেনা। তারপর পড়াশোনা শেষ হলে আমরা বিয়ের পিড়িতে বসতে পারি। আমি আশা করছি তুমি আমার কথা বুঝতে পারছো।’
অরণ্যা বজ্রাহতের ন্যায় ক্ষণকাল চুপ করে রইল। চিরচেনা এ মধুময় ভরাট কন্ঠকে মনে হলো পৃথিবীর সবচাইতে কর্কশ কন্ঠস্বর। তারপর বলল, ‘আমি কোন অবস্থাতেই এবরশন করাবোনা। ভ্রুনহত্যার মতো অন্যায় আমি করতে পারবোনা।’
‘আজকাল সবাই এমনটি করছে। তাহলে তোমার সমস্যা কোথায়?’
‘কে করছে, আর কে করছে না, তা আমি জানতে চাইনা। আমি শুধু বলতে চাই, আমার গর্ভে আশ্রিত দেবশিশুকে আমি কোনভাবেই হত্যা করতে পারবোনা।’
‘তাহলে আমার আর বিশেষ কিছু করার নেই। এই পাপকে তুমি কি করবে তুমি সিদ্ধান্ত নাও।’
অরণ্যা প্রায় চিৎকার করে বলল, ‘পাপ! কাকে তুমি পাপ বলছো? আমার গর্ভে এই পাপের বীজ বপন করেছে কে? নারী বলে কি পুরুষের সকল অন্যায়, সকল পাপ জোর করে নারীর গায়ে চাপিয়ে দেবে?’
স্বপ্নীল চেয়ার থেকে ওঠে অরণ্যার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘শান্ত হও। আমি যা বলছি তাই করো। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
অরণ্যা কোন কথা বললনা। এক ঝটকায় স্বপ্নীলের হাত সরিয়ে দ্রুত পায়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে এলো।

সময়ের হিসেবে চব্বিশ ঘন্টা কিছুই নয়। অথচ এই স্বল্প সময়েই অরণ্যার জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। গ্লাসের স্বচ্ছ পানিতে এক কণা কাদা মিশালে নিমেষেই যেমন ঘোলা হয়ে যায়, ঠিক তেমনি মুহূর্ত্বের একটা ছোট্ট ভুল অরণ্যার জীবনকেও ঘোলাটে করে দিয়েছে। স্বপ্নীল এ সন্তানকে কোনভাবেই পৃথিবীর আলো দেখাতে চায়না। সে স্পষ্ট বলে দিয়েছে বিয়ে করতে পারবেনা। মাও পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, গর্ভের সন্তান নষ্ট না করলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। অরণ্যা স্থির করতে পারছেনা সে কী করবে! সে কিছুই চিন্তা করতে পারছেনা। সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। ভ্রুণহত্যাকে অরণ্যা কোনভাবে মেনে নিতে পারছেনা।
আজ অরণ্যার চারপাশ প্রতিকূল। এই প্রতিকূল পরিবেশে সে কি করবে! অরণ্যা আলতো করে নিজের পেটে স্পর্শ করল। এমনভাবে হাত ছোঁয়ালো যেন সে শিশুটিকে আদর করছে। এখনও শিশুটির অস্তিত্ব বুঝা না গেলেও আর কদিন পরেই যখন উদর স্ফিত হবে তখন সবাই অস্তিত্ব টের পাবে। তখন সবাই ছি ছি রব তুলবে! অরণ্যার মনে হলো এ পৃথিবীতে সে বড্ড একা। তার অতি কাছের মানুষগুলো হঠাত করেই দূরে সরে গেছে। পরম নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে ভরসা করে যার তরে নিজের সমস্ত সত্ত্বা সঁপে দিয়েছিল তারই কারণে আজ সে কলংকিনি।
অরণ্যা মুহূর্ত্বেই সিদ্ধান্ত নিল ভ্রুন যদি হত্যা করতেই হয় তবে সবার আগে সে নিজেকেই শেষ করে দেবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। সে ঘুমের ঔষধগুলো হাতের মুঠোয় ভরে নিল। একটা একটা করে গুনে দেখল মোট তেরটা ট্যাবলেট। এ ট্যাবলেটগুলো সে বাবার কাছ থেকে এনে রেখেছিল কিন্তু কখনো দরকার পড়েনি। আজ যে এমনভাবে কাজে লেগে যাবে তা সে ভাবতেই পারেনি। ঔষধগুলো মুখে পুরার আগে আরেকবার নিজের পেটে হাত বুলিয়ে নিল। হঠাত করে তার দুচোখ জলে ভরে ওঠল। কাঁপা হাতে ঔষধগুলো মুখের কাছে নিয়ে এলো। কিন্তু না সে পারলনা, নিজের জীবনের প্রতি কোন মায়া লাগছেনা, বারবার সেই অনাগত শিশুটির অবয়ব মনে ভেসে ওঠছে। মুখে দেয়ার ঠিক আগ মূহুর্ত্বে সব ঔষধ মেঝেতে ছুড়ে মারল। নিজের জীবনটাকে তুচ্ছ মনে হচ্ছে এ শিশুর জীবনের কাছে। একেই কী বলে মায়ের ভালোবাসা! অরণ্যা তখনই একটা ব্যাগে নিজের কিছু কাপড় আর এটিএম কার্ড গুছিয়ে নিল। এ শিশুকে বাঁচাতে হলে একটা পথই খোলা আর তা হলো পরিচিত পরিবেশ থেকে আড়াল হয়ে যাওয়া।

তারপর কেটে গেছে পুরো নয়টি মাস। পরিচিত পরিবেশ থেকে এতোটা দূরে সরে থেকেও অরণ্যা জীবনটা অনেক আনন্দময়। ঢাকার আকাশের নিচে অচেনা পরিবেশে তাকে খুব বেশী কাঠ-খড় পোহাতে হয়নি। ট্রেনে আসার সময় এক মহিলার সাথে পরিচয়। কথায় কথায় যখন জানতে পারল ইনি একটি নারী বিষয়ক সংস্থায় কাজ করেন তখন সে তার নিজের সব কথা খুলে বলেছিল। পড়াশোনা পুরো শেষ করতে না পারলেও এই অসমাপ্ত শিক্ষাই তাকে পথের ধুলোয় মিশে যেতে দেয়নি। অসমাপ্ত শিক্ষার জোরেই সেই সংস্থায় অফিস সহকারীর চাকরী পেয়ে গেল। জীবনের এ মূহুর্ত্বে সব জায়গায় পরিবেশ প্রতিকূল হলেও এই একটা ক্ষেত্রে স্রস্টা তার সহায় ছিলেন।
এই সময়ে একটু একটু করে তার গর্ভে বেড়ে ওঠেছে দেবশিশু। একটু একটু করে উদর স্ফিত হয়েছে। গর্ভাবস্থায় মেয়েদের পেট বিশ্রী রকমের বড় হয়ে যায়। তাই প্রেগনেন্ট মহিলাদের স্ফিত পেটকে অরণ্যা সবসময় ঘৃণা করতো, কেমন জানি ভয় ভয়ও লাগত। মনে পড়ে, ও তখন বেশ ছোট। মায়ের পেটটা অস্বাভাবিক বড় হয়ে গিয়েছিল। তা দেখে অরণ্যার সে কী কান্না! কাঁদতে কাঁদতে একদিন দাদীকে জিজ্ঞেস করল, ‘দাদী মায়ের পেট এমন বিশ্রী হয়ে গেছে কেন?’
দাদী মৃদু হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘তোমার মায়ের পেটে তোমার একটা ছোট ভাই আছে। আর যেহেতু সে এখন এখন একটু একটু করে বড় হচ্ছে তাই এমনটি দেখাচ্ছে।’
অরণ্যা এ কথা শুনে খুশী হতে পারলনা। সে কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘তাহলে ভাইটি বড় পচা!’ অরণ্যার শিশু মন এ অবস্থা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি। সে মাকে সবসময় এড়িয়ে চলত আর ভাইটিকে বকা দিত।
তারপর একদিন যখন ভাইটি হল, তখন অরণ্যা কাছে গিয়ে দেখল, ভাইটি কাঁদেনা, নড়াছড়া করেনা। বাবা, মা, দাদী, নানী সবাই কাঁদছে। অরণ্যা মনে মনে খুশী হল। ভাইটি উচিত শিক্ষা পেয়েছে! বড় হয়ে যখন বুঝল তখন ওর খুব খারাপ লাগত। অরণ্যার মনে হতো ওর কারনেই ভাইটি মারা গেছে।

আজকাল পেটের মধ্যে দেবশিশুর অস্তিত্ব ভালোভাবেই অনুভব করা যায়। রাগ করে মাঝে মাঝে এমন লাথি দেয় মনে হয়, পেটের মধ্যে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার উত্তেজনাকর ফুটবল ম্যাচ শুরু হয়ে গেছে। এই নতুন পরিবেশে কেউ তার সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেনা। অনেকেই সন্তানের বাবা কোথায় জানতে চেয়েছে। সে যে কুমারী মা একথা বলার সাহস তার হয়নি পাছে আবার কলংকের বোঝা চেপে বসে। সে বুকে পাথর চাপা দিয়ে সবাইকে বলেছে এই সন্তানের বাবা মারা গেছে। এই সময়ে সে একটিবারও বাসার কোন খোঁজ নেয়নি। বাবা-মার কথা মনে হতে অনেকবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করেছে কিন্তু ফিরে যেতে পারেনি। বাবা-মা যখন দেখবে সে স্বপ্নীলের সাথে পালিয়ে যায়নি তখন নিশ্চয় ভাববে সে আত্মহত্যা করেছে। স্বপ্নীলও তাই ভাববে। এইটেই ভাল।

চারতলা দালানের এই মেসবাড়ি শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য। এখানে ছেলেদের প্রবেশাধীকার নিষিদ্ধ। মেয়েদের জন্য এটি বেশ নিরাপদ আবাস। ছাত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মহিলা এখানে থাকছে। দুতলায় সিড়ির সাথে লাগোয়া একটি রুমে অরণ্যা থাকে। আজ সকাল থেকেই তার রুমে ভিড় জমেছে। প্রত্যেক তলার মেয়েরা তার রুমে এসে জমা হয়েছে। সে সবাইকে দেখছে কিন্ত কাউকে বসার কথা বলতে পারছেনা। সে বিছানাতে প্রসব বেদনায় কাতর। মাথার কাছে মেসের হোস্টেস বসে আছেন। তিনি মাথায় হাত বুলাচ্ছেন আর বলছেন, ‘চিন্তা করোনা মা। আমরা সবাই আছি।’
বিছানার পাশে বসে আছেন মেসের আরেকজন সদস্যা, যিনি একটি প্রাইভেট মেডিকেলের ডাক্তার। তিনি স্নেহের সুরে অরণ্যাকে বললেন, ‘একটু সহ্য করো।’ বলেই দু-জন ছাড়া আর সবাইকে রুম থেকে বের করে দিলেন।

সমস্ত পৃথিবী যেন অন্ধকার হয়ে এসেছে। চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে আসছে। অসহ্য ব্যথায় অরণ্যা কাতরাচ্ছে। মাতৃত্বের এই অসহ্য যন্ত্রণা যে কতোটা ভয়ানক তা মা মাত্রই জানে। একজন মা কতোটা যুদ্ধ করে তার সন্তানকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন অথচ সন্তান বড় হয়ে সে মার মনে কষ্ট দিতে একটুও দ্বিধা করেনা। অনেকদিন পরে মায়ের কথা মনে হল অরণ্যার। সে নিজেও তো মায়ের মনে কষ্ট দিয়েছে। মাকে দেখার ভীষন ইচ্ছে হল। অরণ্যার মনে হচ্ছে, এই শিশুকে জন্ম দিতে গিয়েই সে মারা যাবে। এ অবস্থাতেই সে স্রস্টার কাছে আকুতি জানাল, হে স্রস্টা, আমি মারা যাওয়ার আগে অন্তত একবার আমার সন্তানকে দেখতে দিও।
যুদ্ধ বুঝি একেই বলে। ভরা ময়দানে অজস্র সৈন্যের মাঝখানে একটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে। তাকে উদ্ধার করতে পারে একমাত্র শিশুটির মা। তাকে একাকী ঐ যুদ্ধে অবর্তীণ হতে হবে। নিজের প্রাণ গেলেও সেই দূর্ভেদ্য ব্যুহ ভেদ করে শিশুটিকে নিয়ে আসতেই হবে। এই কঠিন যুদ্ধে অরণ্যা জয়ী। মাত্রই সে যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ফিরে এসেছে। পৃথিবীর বুকে নিয়ে এল তার অন্তরাত্মাকে। অরণ্যা পাশ ফিরে দেবশিশুর পানে তাঁকাল। মা ও শিশু দুজনের চোখেই যুদ্ধ জয়ের হাসি। যুদ্ধ জয়ের এই স্নিগ্ধ, পবিত্র হাসি বুঝি সম্রাট আলেকজান্ডার সারা পৃথিবী জয় করেও হাসতে পারেননি।

Advertisements

বেনাট

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

এ মাসের মধ্যেই অফিসের চূড়ান্ত বাজেট পেশ করতে হবে। তাই ছুটির দিনেও একগাদা ফাইলপত্র বিছানায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে উপুড় হয়ে হিসাব কষছিলাম। পাশের ঘরে একমাত্র মেয়ে ঝিনি হাই ভলিঊমে টম এন্ড জেরী দেখছে। উচ্চ শব্দের জন্য প্রায়ই মনোযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রায়ই হিসেবে তালগোল পাকিয়ে ফেলছিলাম। এ ঘর থেকে হাঁক দিলাম, এই ঝিনি টিভি বন্ধ করবি নাকি ও ঘরে এসে তোর ঘাড় মটকাবো। কথাটা শুনেই পাশের ঘরে কচি কন্ঠের হাসির গাড়ি ছুটলো। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গ করে ঝিনি বললো, বাবা তুমি ভুত নাকি! বলেই হাসতে হাসতে পালালো। সেইসাথে টিভির শব্দও বন্ধ হয়ে গেলো।

একটা করে হিসাব কষছি আর এক্সেলের ওয়ার্কশীটে এন্ট্রি করছি। যেই না ওয়ার্কশীটে গুটিকয়েক ডাটা এন্ট্রি করেছি ওমনি বেলকনিতে কিছু একটার শব্দ হতেই বাইরে চোখ দিলাম। বিরক্তিভরে বেলকনিতে চোখ রাখতেই অবাক হলাম। বেলকনির দেয়ালে একটা বানর বসে আছে। ইট-পাথর-কংক্রিট এর যাঁতাকলে পিষ্ট এ শহরে হঠাত করে বানর দেখতে পেয়ে ভীষণ আশ্চর্য্য হলাম। বানরটির গায়ের রঙ বেশ উজ্জ্বল। বিভিন্ন রঙ্গের লোমে সমস্ত দেহ আবৃত। মুখের দিকে তাঁকালে মনে হয় কে যেন সমস্ত মুখমন্ডল আগুনে জ্বলসে দিয়েছে। পোড়া মুখের আড়ালে উজ্জ্বল মারবেল পাথরের মতো চকচক করছে দুটি মায়াবী নিষ্পাপ চোখ। এতোক্ষণে ঠাওর করতে পারলাম এটা বানর নয় কালোমুখী হনুমান। স্থানীয়ভাবে মুখপোড়া হনুমান নামেই বেশী পরিচিত। ছোটবেলায় কোন দুষ্টুমি করলে মা মুখপোড়া হনুমান বলে বকা দিতেন। আজ সেই মুখপোড়া হনুমান আমার সামনে বসে আছে। জীবনে প্রথমবারের মতো মুখপোড়া হনুমান দেখতে পেয়ে আমি বেশ উত্তেজিত বোধ করছিলাম।

ইতোমধ্যে পাশের ঘর থেকে ঝিনিও আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সদ্য আটে পা দেয়া ঝিনি তার ফোকলা দাঁত বের করে অবাক বিষ্ময়ে হনুমানের দিকে তাঁকিয়ে রয়েছে।

হনুমানটি হাত নেড়ে কিছু ঈশারা করছে। আমরা বাপ-মেয়ে একে-অপরের দিকে তাঁকালাম। কিন্তু কেউই হনুমানটির ঈশারার অর্থ বুঝলাম না। ঝিনি বললো, বাবা, ও মনে হয় কিছু খেতে চাচ্ছে। আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই ঝিনি ওর হাতের কলাটি হনুমানের দিকে ছুড়ে মারলো। হনুমানটি মেঝে থেকে কলাটি কুঁড়িয়ে নিলো। তারপর নিজে নিজেই খোসা ছাড়িয়ে খেতে লাগলো। ঝিনি আর আমি অবাক হয়ে দেখছি। ঝিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলো, বাবা হনুমানটার মুখ এত্তো কালো কেন? আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম এটা বানর নয়। বানর প্রজাতির একটি প্রাণী হনুমান। আর এটা হচ্ছে কালোমুখী হনুমান তাই এর মুখ কালো। হনুমানের মুখের দিকে তাঁকিয়ে মনে হলো খাবার পেয়ে সে ভীষণ খুশী হয়েছে। শিশুরা যে প্রাণীদের কথা বুঝতে পারে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেলাম। কলা শেষ করে হনুমানটি আড়মোড়া ভাঙ্গার মতো রাজকীয় ভঙ্গিতে একটা মোচড় দিলো। তারপর আমাদের দিকে বিদায় জানানোর মতো হাত নেড়ে পাশের গাছে ঝাঁপ দিলো। ছোট বাচ্চাদের মতো অবাক ভঙ্গিতে আমিও হনুমানের চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলাম। এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফাতে লাফাতে হনুমানটি একসময় চোখের আড়ালে চলে গেলো।

এরপর থেকে প্রায়ই হনুমানটিকে দেখা যেতে লাগলো। বেলকনিতে এসে লক্ষীটির মতো চুপচাপ বসে থাকে। ইতোমধ্যে ঝিনির সাথে হনুমানটির বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। এরই মধ্যে ঝিনি হনুমানটির একটা নাম দিয়েছে। নামটা বেশ অদ্ভুত! বেনাট। আমি অবাক হয়ে ঝিনিকে জিজ্ঞেস করলাম, এমন অদ্ভুত নাম দিয়েছো কেন মামনি? উত্তর যেন ওর ঠোটের মধ্যেই ঝুলানো ছিলো। সাথে সাথে উত্তর দিলো, হনুমানটা শুধু কলা আর বাদাম খায়। অন্য কিছু খায়না। তাই বেনানার বে আর নাটের নাট নিয়ে ওর নাম দিয়েছি বেনাট। সুন্দর হয়েছে না বাবা? আমি ঝিনির সাংঘাতিক বুদ্ধির প্রমাণ পেয়ে মনে মনে খুশী হলাম। তারপর মৃদু হেসে বললাম, বেশ সুন্দর হয়েছে মা।

ঝিনি প্রতিদিনই হনুমানটিকে বিভিন্ন রকম খাবার দেয়। হনুমানের জন্য বাজার থেকে বাদাম, কলা আনতে আমাকে বাধ্য করে। মাত্র কয়েক সপ্তাহে হনুমানটি আমাদের অনেক আপন হয়ে গেছে। আমার অসম্ভব বদমেজাজী স্ত্রীও হনুমান ওরফে বেনাটকে বেশ আপন করে নিয়েছে। হনুমানটির পরিচ্ছন্নতা ও আচার ভঙ্গিতে মনে হয় এটা কারো গৃহপালিত ও প্রশিক্ষিত। বন জঙ্গলের প্রাণী এমনটি হওয়ার কথা নয়। ঝিনি আর বেনাট মিলে সারাদিন খেলা করে। ঝিনি বেনাটকে ওর ছোট্ট ছোট্ট টপস আর জিন্স টাউজার পড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। ঝিনি বেনাটের মাথায় পড়িয়ে দেয় ছোট্ট ক্যাপ। ক্যাপটা বেনাটকে ভীষণ মানিয়েছে। বেনাট যেন লজ্জ্বায় রাঙ্গা হয়ে যায়। মুখ আড়াল করে পালানোর চেষ্টা করে।

ঘরের ভেতর পর্যন্ত বেনাটের প্রবেশাধীকার বিস্তৃত হয়েছে। ড্রয়িং রুমের সোফায় গা এলিয়ে ঝিনি আর বেনাট আয়েশ করে পোগো আর কার্টুন নেটওয়ার্কে মজে থাকে। কার্টুন মুভি দেখে দুজনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। একদিন সাইকেল চালাতে গিয়ে ঝিনির পায়ের খানিকটা কেটে গিয়েছিলো। বেশ রক্তও গড়িয়ে পড়ছিলো। তা দেখে বেনাটের সে কী দৌড়ঝাঁপ! একটা বন্য প্রাণী কখন যে আমাদের এতোটা আপন হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি।

দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার। সকালবেলা ঝিনিকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছিলাম। রিকশার খোঁজ করতে করতে গলির মোড়ে এসে দাঁড়ালাম। রাস্তার বাঁ-দিকে তাকাতে মানুষের জটলা চোখে পড়লো। একটু সামনে এগিয়ে একজন লোককে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপার কি? লোকটি কোন উত্তর না দিয়ে সামনে এগুনোর রাস্তা ছেড়ে দিলো। লোকটির ছেড়ে দেয়া রাস্তা ধরে সামনে এগুতে দেখলাম মাটিতে বেনাট শুয়ে আছে। বেনাটকে দেখে দ্রুত সামনে এগিয়ে গেলাম। আমার পিছু পিছু ঝিনিও এগিয়ে এলো। পাশ থেকে একজন বললো, রাস্তা পার হওয়ার সময় একটা মাইক্রোবাস বেনাটকে ধাক্কা দিয়েছে।

বেনাটের ঘাড় থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। অবিরাম রক্তক্ষরণে সে নিস্তেজ হয়ে গেছে। বেনাটকে এ অবস্থায় দেখে ঝিনির দু-চোখ জলে ভরে ওঠে। ঝিনি বেনাটকে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। ঝিনিকে দেখে বেনাট দু-বার ঠোট নাড়লো। ও যেন কিছু বলতে চাইছে। ঝিনি আমাকে বারবার তাগিদ দিলো, বাবা, বেনাটকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো। আমি বেনাটকে কাছের পশু হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বললেন বেশ সিরিয়াস ইনজুরি তবে চিন্তার কিছু নেই। ডাক্তারের কথায় আমি কিছুটা আশ্বস্ত হলেও ঝিনিকে বুঝানো যাচ্ছিলোনা। ওকে যতো বলি বেনাটের কিছু হবেনা সে ততো জোরে জোরে কান্না শুরু করে। ডাক্তার প্রথমে ইনজেকশন দিলেন। তারপর ঘাড়ের ক্ষতস্থানটি পরিস্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। বেশ কিছুটা সময় পর বেনাট চোখ খুললো। তার চেহারার নিস্তেজ ভাব কাটতে শুরু করেছে। বেনাটকে চাইতে দেখে ঝিনির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সে এক হাতে চোখের পানি মুচছে আরেক হাতে বেনাটের শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ঝিনির হাতের কোমল স্পর্শে বেনাট পাশ ফিরে ঝিনির দিকে তাঁকিয়ে যেন মৃদু হাসলো। ঝিনিও একটা মৃদু হাসি দিলো। দুই বন্ধুর মধ্যে কি যেন গোপন কানাকানি হয়ে গেলো সবার অন্তরালে।

(সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রাণী অধিকার সংগঠন “প্রাধিকার’ এর জার্নালের প্রথম সংখ্যায় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের পাশাপাশি একমাত্র গল্প হিসেবে আমার লেখা এই গল্পটি প্রকাশ হয়েছে। এই গল্পের মতো তাড়াহুড়ো করে আর কোন গল্প আমি লিখিনি। কাজেই গল্পের অনেকাংশ ঠিকমতো সাজাতে পারিনি।)

উপন্যাসঃ আপাতত শিরোনামহীন (১ম খন্ড)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

এখনো উপন্যাসটির নাম নির্ধারণ করা হয়নি তাই আপাতত উপন্যাসটি শিরোনামহীন। পরবর্তীগুলো এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
১.
বিস্তীর্ণ মাঠ পেরিয়ে, নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাঝারী আকারের একটি ঝাউ গাছ। নদী থেকে ভেসে আসা মৃদু মিষ্টি বাতাস যখন ঝাউয়ের শাখায় ঢেউ তুলে যায় তখন সমস্ত সত্ত্বা এক অদৃশ্য ভালোলাগার আবেশে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত ভালোলাগা-ভালোবাসা এখানে এসে একই মোহনায় মিশেছে। জীবনের সব বেদনা যেন আনন্দের ফেরীতে করে মন সমুদ্রে এখানে ভেসে বেড়ায়।
ঝাউ গাছটাকে কেন জানি খুব আপন মনে হয় সুন্দরের। যখন কোন কাজ থাকেনা তখনই সে ঝাউতলায় এসে বসে থাকে। ঝাউতলার শ্যামল ছায়ায় বসে তাকিয়ে থাকে স্রোতসিনী নদীর পানে। মাঝে মাঝে মনে হয় এ পাশটায় যদি একটা ঘর থাকতো তবে বেশ হতো। সারাদিন এখানে বসে তরঙ্গিনী কুশিয়ারার ছল ছল জলধারায় হারিয়ে যেত।
কুশিয়ারার স্বচ্ছ জলে প্রতিনিয়ত ভেসে চলে শত শত নৌকা। এদের অধিকাংশই জেলে নৌকা, মাঝে মাঝে দু-একটা যাত্রীবাহী নৌকার দেখা মেলে। মাঝিরা মনের সুখে গেয়ে চলে জারি, সারি আর ভাটিয়ালী গান। ঝাউয়ের শন শন, কুশিয়ারার ছলাৎ ছলাৎ আর মাঝির সুমধুর কন্ঠে গাওয়া গান মিলেমিশে এক মধুর ছন্দময় পরিবেশের সৃষ্টি করে।
আকাশ বাণীতে মান্না দে’র গান শুনতে শুনতে সুন্দর কখন যে ঝাউতলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলো বুঝতেই পারেনি। ঘুম যখন ভাঙ্গলো তখন দিনের সূর্য্য ধীরে ধীরে পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ছে। সারাটি দিন অবিরাম তেজরশ্নি বিকিরন করতে করতে ক্লান্ত লাল সূর্য্যটা কুশিয়ারার বুকে একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে। সুন্দর আর সেখানে বসে না থেকে নীল জমিনে কালো ডোরাকাটা দেয়া শার্টটা গায়ে চাপিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়।
কয়েক কদম সামনে এগুতেই পেছন থেকে কার যেন ডাক পাওয়া যায়। পেছনে তাকাতেই সুন্দরের চোখে পড়ে করিম মাঝি ঘাটে নৌকা ভিড়িয়েছে। করিম মাঝি হাত দিয়ে ঈশারা করে হাঁক দিয়ে ডাকে, বাবাজী এইদিকে আসো। সুন্দর গুটিপায়ে ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। দেখতে পায় বেশ ভদ্র চেহারার কয়েকজন মানুষ নৌকার পাঠাতনে বসে আছেন। করিম মাঝি বলে, বাবা সুন্দর, উনারা এই গ্রামে নতুন এসেছেন, রাস্তাঘাট কিচ্ছু চেনেন না। তুমি উনাদের একটু নিজাম ব্যাপারীর বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দাও। সুন্দর হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে।
সবার আগে নৌকা থেকে নামলেন একজন বয়স্ক লোক। লোকটির চোখে ভারী পাওয়ারের মোটা, কালো চশমা। গালের চামড়ায় খানিকটা ভাঁজ পড়লেও মোটা গোঁফের কারণে বেশ একটা আভিজাত্যের প্রলেপ লেপ্টে আছে মুখাবয়বে। তাকে অনুসরন করে নৌকা থেকে নামলেন একজন মধ্যবয়সী মহিলা। সুন্দর অনুমান করে ইনি এই বয়স্ক লোকের স্ত্রী। মধ্যবয়সে এসেও মহিলার সৌন্দর্য্যে একটুখানি আঁচড় লাগেনি। সুন্দর বুঝতে পারে বয়স্ক লোকটি বেশ বয়স করে বিয়ে করেছেন। তারপর বছর দশেকের একটি ছোট্ট ছেলে পাঠাতন থেকে নামে।
সবার শেষে নৌকার পাঠাতন থেকে নামলো একটি মেয়ে। মেয়েটিকে দেখে সুন্দরের চোখ যেন ছানাবড়া হয়ে গেলো। এমন নজড়কাড়া মেয়ে এর আগে এ গ্রামে একটিও দেখা যায় নি। ডাগর ডাগর চোখের এ মায়াবিনী যেন কোন স্বপ্নপূরীর বাসিন্দা। নবযৌবনা এ রুপসীকে স্রষ্টা যেন নিজ হাতে কারুকার্যমন্ডিত করেছেন। এই উর্বশীকে দেখে জীবনে প্রথমবারের মতো সুন্দরের হৃদয়ে এক অন্যরকম আলোড়ন হয়। প্রিয় ঝাউগাছ আর সদা চঞ্চলা স্রোতসিনী কুশিয়ারাকেও ম্লান মনে হয় স্রষ্টার এই অপূর্ব সৃষ্টির কাছে।
লোকটি সুন্দরকে জিজ্ঞেস করেন, এখান থেকে ব্যাপারী বাড়ি কতোদূর?
সুন্দর মেয়েটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো। সে সামলে নিয়ে বলে, বেশ খানিকটা দূরে। অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।
ব্যাপারী বাড়ি যাওয়ার পথে কারো মধ্যে খুব একটা কথা হলোনা। সুন্দর দু-একবার কথা বলেছিল। কিন্তু বয়স্ক লোকটি গম্ভীরস্বরে হু-হা দিয়েই উত্তর সেরেছিলেন। তাই আর কথা না বাড়িয়ে সুন্দর সামনে এগুতে থাকে।
আলোকিত পৃথিবী একটু একটু করে অন্ধকারের অতল গহবরে লুকিয়ে যাচ্ছে। একটু আগেও বারকয়েক সুন্দরের সাথে মেয়েটির চোখাচোখি হয়েছে। প্রত্যেকবারই সুন্দর চোখ সরিয়ে নিয়েছে। সুন্দরী মেয়েদের দিকে তাকালে ওর বুকটা খালি হয়ে যায়। কেন যেন খুব ভয় ভয় করে। রাস্তার এপাশটা একটু বেশী অন্ধকার হওয়ায় এখন আর মেয়েটিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা, সবকিছু ঝাপসা লাগছে। ব্যাপারী বাড়ি পৌছে দিয়ে আসার সময় সে ভালো করে দেখে নেয় মেয়েটিকে।
উত্তর পাড়ার খাল পাড়ি দেয়ার সময় পাশের মসজিদ থেকে সুন্দরের কানে ভেসে আসে আযানের ধ্বনি। দূরের হিন্দু বাড়িগুলো থেকেও ভেসে আসছে শাখ-উলুধ্বনি। আযান আর শাখের সুমধুর তীক্ষ্ণধ্বনি দুয়ে মিলে খুব সুন্দর একটা পবিত্র আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের গ্রামে হিন্দু-মুসলিম কোন দ্বন্ধ নেই। দু-এক ঘর নব্য মুসলিম লীগার ভিতরে ভিতরে হিন্দু বিদ্বেষী থাকলেও বাইরে তা প্রকাশ করে না। সুন্দর তার বাবা-দাদাদের কাছে শুনেছে, ৪৭ এর দেশ বিভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানের অনেক জায়গায় হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গা বেঁধে গিয়েছিলো। অনেক হিন্দু নিজ বাড়িঘর ফেলে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলো প্রাণরক্ষার্থে। কিন্তু তাদের গ্রামে এরকম কোন দাঙ্গা বাঁধেনি। কোনকালেই তাদের গ্রামে হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ ছিলোনা। দূর্গা পুজোর সময় ওর মুসলিম বন্ধুরা ষষ্ঠির রাত থেকেই ওদের বাড়িতে আস্তানা গড়ে আর দশমীর প্রতিমা বিসর্জনের পর বাড়ি ছাড়ে। সুন্দর নিজেও শবে বরাতের রাতে বন্ধুদের নামাজ শেষে সারা রাত আড্ডা দেয়। ঈদের দিন সকালে উঠেই বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে হাতে বানানো সেমাই খায়।
বাড়িতে যেতেই মা ধরলেন, কী রে সেই যে দুপুর খেয়ে বেড়িয়েছিলি আর এখন ফিরলি! এতোক্ষন কোথায় ছিলি?
সুন্দর কোন কথা না বলে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। ঘরে ঢুকে সুন্দর তো একেবারে আশ্চর্য্য! আজ অনেকদিন পর বড়দি এসেছে। অনেকদিন পর দুই ভাইবোন একসাথে হয়েছে। বড়দি যখন বাড়িতে আসে তখন সুন্দর প্রায়ই হোস্টেলে থাকে ফলে ওর সাথে দেখা হয়না বললেই চলে। তাই এবার সে বাড়িতে থাকায় বড়দি চলে এসেছে। সুন্দরের আনন্দ দেখে কে!
বড়দির পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে যেতেই বড়দি বাধা দিয়ে বলে, আরে এ কী করছিস! তোর স্থান পায়ে নয় ভাই। বড়দির চোখ জলে ভরে ওঠে। কান্না মাখানো কন্ঠে বলে, আজ কতোদিন পর তোকে দেখছি। বাড়িতে আসলে একটিবার তো আমাকে দেখতে যেতে পারিস? সুন্দর অপরাধবোধের হাসি হেসে নিজের দোষ স্বীকার করে নেয়।
পরক্ষণে সুন্দর অভিমান ভরা কন্ঠে বলে, তুমিও তো সিলেট গেলে আমার সাথে দেখা না করেই চলে আসো। পরে অন্য কারো কাছ থেকে জানতে হয় তুমি এসেছিলে।
বড়দি বলে, সেই কবে গিয়েছিলাম সিলেট। আমার ননদ রুমকি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। তাই ওকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিলো। ওর অবস্থা এতোটাই খারাপ ছিলো যেন যমে-মানুষে টানাটানি। তাই কারো সাথেই দেখা করা হয়নি। রাগ করিস না ভাই।
সুন্দর বলে, হুম, রুমকির কি হয়েছিলো?
বড়দি বলে, হঠাৎ করে পেটে ব্যাথা উঠলো। যন্ত্রণায় এমন কাতরাচ্ছিলো যে, সে রাতেই ওকে সিলেট আনা হয়। ডাক্তার কি একটা রোগের নাম বলেছে ঠিক খেয়াল নেই।
সুন্দর জিজ্ঞেস করে, এখন অবস্থা কেমন?
বড়দি বলে, এখন কোন সমস্যা নেই। ভালো আছে।
দুই ভাই-বোনের মনে অনেক গল্প জমেছে। অনেক রাত অবধি চললো গল্প। তাদের সাথে গল্পে যোগ দিলেন বাবা-মা। রাতে খাওয়া-দাওয়া করে বিছানায় যেতে বেশ দেরী হয়ে গেলো। বিছানায় শুয়ে সুন্দরের চোখে ঘুম আসছেনা। শুধুই ওই মেয়েটির কথা মনে পড়ছে। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে ভোর রাতের দিকে তার চোখে ঘুম আসলো।
২.
ও ডাক্তার বাবু, বাড়িতে আছেন নাকি?
সুন্দরের বাবা বিমল বাবু ডাক শুনে উঠোনে বের হলেন। গতরাতে মরসুমের প্রথম ঝড়ো বৃষ্টিতে পুরো উঠোন ভিজে আছে। গাছের পাতা আর ভাঙ্গা ডাল সারা উঠোন জুড়ে ছড়ানো। উঠোনের ঠিক মাঝখানে করিম মাঝি আমগাছের একটি নিচু ডাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে ভেজা লুঙ্গি আর পাতলা হাফশার্ট। লুঙ্গিটা হাটু অবধি তোলা। পায়ে লেগে আছে ভেজা থকথকে কাদা-পানি। বাম কাঁধে ঝুলানো মাছ ধরার জাল দেখে বুঝা যাচ্ছে মাত্রই নদী থেকে মাছ ধরে ফিরেছে।
শেষরাতের মৃদু ঝড়ে গাছ থেকে ঝরে পড়েছে অনেক কচি আম। করিম মাঝি সেখান থেকে একটি কচি আম তুলে নিয়ে হাতের তালুতে ঘষে বালু ছাড়িয়ে নেয়। আয়েশ করে কামড় দিতেই মুখটা বিস্বাদ হয়ে যায়। কচি আমের আষটে কষে জিহবা তিথিয়ে ওঠে। সে আমটা ছুড়ে ফেলতেই দেখে বিমলবাবু দাঁড়িয়ে আছেন।
বিমল বাবু হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে বলেন, কি মিয়া এই ঝড়-বাদলার সকালে মাছ ধরতে বের হয়েছো?
করিম মাঝি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে, কি করবো বলেন। নেশাটা ছাড়তে পারিনা। একটু অবসর পেলেই পুরনো নেশাটা মাথাছাড়া দিয়ে ওঠে। মাছ ধরার নেশা গাঞ্জার নেশা থেকে কম নয়।
বিমল বাবু বলেন, বুঝলাম, কিন্তু এই বয়সে এতো পরিশ্রম কি আর শরীর মানবে। একটু দেখেশুনে কাজ করো।
করিম মাঝি হাসতে হাসতে বলে, কি যে বলেন ডাক্তার বাবু! গরীবের আবার শরীর! এখন শরীরকে বিশ্রাম দিতে গেলে শরীর আরো বসে যাবে। তাছাড়া জোয়ানকালে কি শীত, কি বর্ষা, কত্তো মাছ ধরেছি।
বিমল বাবু মাথা নেড়ে বলেন, জোয়ানকাল আর বুড়ো বয়স কি এক হলো! তুমি যে বুড়ো হয়েছো সে খেয়াল কি আছে? জোয়ানকালে শরীরে থাকে অন্যরকম শক্তি। আর বুড়ো বয়সটা হলো ক্ষয়ে যাওয়ার। শরীর অপেক্ষায় থাকে ঝোঁপ বুঝে কোপ মারার। এই বয়সে বাচ্চাদের মতো একটু অনিয়ম করলেই চেপে বসতে চায় রোগের পাহাড়। আজ বাতের ব্যাথা তো, কাল শ্বাসকষ্ট, তো পরশু বুক ব্যাথা। এভাবে একদিন ভবলীলা সাঙ্গ করে একেবারে পগারপার।
করিম মাঝি শব্দ করে হাসতে হাসতে বলে, ডাক্তার বাবু আপনি যে বুড়ো হয়েছেন এইবার বুঝা যাচ্ছে। আপনার মধ্যে আস্তে আস্তে মৃত্যুভয় বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। আমি মরণ ভয় পাইনা। উপরওয়ালার যেদিন ইচ্ছা হবে সেদিন এমনিতেই ডাক পড়বে। পাশের গ্রামের অজিত বাবুকে দেখছেন তো, অনেকদিন থেকেই বিছানায় পড়ে আছে। বিছানায় প্রস্রাব-পায়খানা করে কতো কষ্ট পাচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন এখন বিরক্ত হয়ে গেছে। লোকটা মরে গেলে তারা যেন প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু ওই যে উপরওয়ালার ডাক এখনো না আসায় প্রাণটা ঝুলে আছে।
করিম মাঝি কথাগুলো শেষ না করেই খানিকটা নিচু হয়ে জাল থেকে বের করে আনে বেশ বড় একটা কচ্ছপ। বিমল বাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, আজ একটাও মাছ ধরলোনা। তার বদলে আটকা পড়লো এই কচ্ছপ। তাই আপনার জন্য নিয়ে এলাম। বৌদিকে বলবেন আপনাকে ভালো করে যেন রেঁধে দেয়।
বিমল বাবু বলেন, প্রত্যেকবার কচ্ছপ ধরা পড়লেই কি আমার জন্য নিয়ে আসতে হবে নাকি! আজকাল কচ্ছপের যা দাম বেড়েছে তুমি বাজারে বিক্রি করলে বেশ ভালো দাম পেতে।
বিমল বাবু ইতঃস্তত করে পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দিতেই করিম মাঝি বলে, ডাক্তার বাবু এইটার জন্য যদি কোন টাকা-পয়সা বের করেছেন তবে আজকের পর থেকে আপনার সাথে আমার কথা বন্ধ।
বিমল বাবু আর কিছু বলতে সাহস পাননা কেননা করিম এমনিতে সাধাসিধে কিন্তু কোন কারনে একবার ক্ষেপে গেলে সামলানো দায়।
বিমল বাবু হাসতে হাসতে বলেন, তুমি মিয়া সেই করিমই রয়ে গেলে যে শুধু মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে দিয়ে যায়। সারা জীবন শুধু পরের জন্য করে গেলে কিন্তু নিজের জন্য কিছুই করলে না। নিজের বাড়িটা পর্যন্ত বোনের নামে লিখে দিলে।
করিম মাঝি বলে, আমার আবার নিজ বলতে কিছু আছে নাকি। বিয়ের প্রথম বছরেই বাচ্চা হতে গিয়ে খিচুনি উঠে বউ মারা গেলো। ছোটবোনটাকেও কতো শখ করে ভালো ঘরে বিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম স্বামীর ঘরে গিয়ে মা-বাপ মরা বোনটা সুখে থাকবে। কিন্তু না তা হলোনা। সেই বোনকে ওর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমার জায়গা-জমির জন্য অত্যাচার করতো। তখন বোনের শান্তির জন্য এটুকু ত্যাগ স্বীকার করা আমার কর্তব্য ছিলো।
বিমল বাবু কিছুটা লজ্জ্বিতবোধ করেন। করিম মাঝির লুকানো ক্ষতগুলো তিনি আবার খুঁচিয়ে খঁচিয়ে বের করছেন। তিনি করিমের পুরনো ক্ষতগুলো সামনের দিকে আর এগুতে না দিয়ে বলেন, তারপর এখন যাবে কোথায়?
করিম মাঝি, একটা মৃদু হাসি দিয়ে বলে, কই আর যাবো! যাওয়ার তো আর একটা জায়গা। ভাগ্যিস শামসু ওর বাড়িতে একটা ঘর তুলে দিয়েছিলো নাহলে বানের জলের মতো কোথায় যে ভেসে যেতাম!
বিমল বাবু বলেন, শামসু মানুষ হিসেবে আসলে অনেক ভালো।
করিম মাঝি বলে, ভালো কি ডাক্তার বাবু! ও আসলে একজন ফেরেস্তা। এই চাচাতো ভাইটি আমাকে বড্ড মায়া করে। এতো অভাব-অনটনের মধ্যেও প্রত্যেকবার খাওয়ার আগে আমার খোঁজ করে। খাই আর না খাই এই মায়ার কোন তুলনা হয়না।
করিম মাঝি ঠিক যখন চলে যাবে তখন ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সুন্দর। বের হওয়ার সময় দরজার দেঊড়িতে পা লেগে বুড়ো আঙ্গুলের নখ খানিকটা উঠে গেলো। করিম মাঝি সেটা লক্ষ্য করে সুন্দরকে বলে, বাবাজী, বেশী ব্যাথা লাগছে নাকি?
সুন্দর ব্যাথা সত্ত্বেও মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো, না চাচা বেশী লাগেনি। আপনি এই সাতসকালে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন নাকি?
করিম মাঝি বলে, বুঝছো বাবা, ফযরের নামাজের পর কোন কাজ ছিলোনা। ভাবলাম তাহলে মাছ ধরলে ভালো হয়। কিন্তু ভাগ্য খারাপ, আজ কোন মাছ ধরলোনা। সব মাছ মনে হয় অনশন পালন করছে।
সুন্দর আঙ্গুলের ব্যাথা সত্ত্বেও মৃদু হাসে। বাবার পাশে মাটিতে উলটো করে রাখা কচ্ছপের দিকে চোখ পড়তেই বিমল বাবুকে জিজ্ঞেস করলো, বাবা এটা কোথা থেকে আসলো?
বিমল বাবুকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে করিম মাঝি বললো, মাছ ধরলো না বটে, তবে কচ্ছপটা ধরা পড়ে গেলো। তোমার বাবা আবার কচ্ছপের মাংস অনেক পছন্দ করেন। তাই ভাবলাম উনাকেই দিয়ে যাই।
বিমল বাবু ছাড়া ঘরের আর কেউ কচ্ছপ পছন্দ করেনা। সুন্দর তো ভুলেও কখনো কচ্ছপের মাংস খায়না। যদি কখনো ভুলে ওর পাতে তুলে দেয়া হয় তখন কচ্ছপের পিঠের শক্ত, কুৎসিত খোলসের কথা মনে পড়ে যায়। সেদিন ও আর ভাতই খায় না।
বিমলবাবু বললেন, সুন্দর এটা তোমার মার কাছে দিয়ে আসো।
অনিচ্ছাসত্ত্বে সে কচ্ছপটা রান্নাঘরে মায়ের কাছে দিয়ে বাড়ির পেছন রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে পড়লো। গতকালকে দেখা মেয়েটিকে না দেখলে চলছেনা। সে ভাবতেই পারছেনা একটি অচেনা মেয়ে তার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সে হাটা ধরলো নিজাম ব্যাপারীর বাড়ির দিকে।
নিজাম ব্যাপারীর ছেলে মালেক সুন্দরের বন্ধু। সে ব্যাপারী বাড়ি গিয়ে মালেকের খোঁজ করলো। মালেকের আম্মা জানালেন মালেক বেরিয়ে গেছে। ফিরে আসার সময় সুন্দর সাহস করে জিজ্ঞেস করে, চাচী গতকাল যারা এসেছে তারা কারা?
মালেকের আম্মা মৃদু হেসে জানালেন, ওই বয়স্ক লোকটি পোষ্ট অফিসের নতুন পোষ্টমাস্টার। বাজারের পাশে থাকার মতো ভালো জায়গা না থাকায় এ গ্রামে উঠেছেন।
তাদের গ্রাম থেকে বাজার একেবারে কাছে। নদী পার হলেই বাজার। তাই থাকার জন্য পোষ্টমাস্টার এ গ্রাম বেছে নিয়েছেন। সুন্দর ইতঃস্তত করে জিজ্ঞেস করে, তারা কি আপনাদের বাড়িতেই থাকবেন?
সুন্দরের দিকে চেয়ে মালেকের মা কিছু বোঝার চেষ্টা করেন। তারপর বলেন, উত্তর পাড়ার সন্তোষ গুহের বাসায় দুটো ঘর খালি ছিলো। তোমার চাচা সন্তোষ বাবুকে বলে ওখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এবার সুন্দরকে বেশ আনন্দিত দেখায় কেননা তাদের বাড়ি থেকে সন্তোষ জেঠুর বাড়ি খুব একটা দূরে নয়।


গতরাতে হালকা ঝড়ো হাওয়ার সাথে বেশ ভারী বৃষ্টি হয়ে গেছে। মরসুমের প্রথম বৃষ্টিতে প্রকৃতি নতুন সাজে সজ্জিত হয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটি গাছের পাতা সবুজ থেকে সবুজতর হয়ে ওঠেছে। ছোট্ট ছেলেমেয়েরা দলে বেঁধে ঝড়ে পড়ে যাওয়া আম কুড়োচ্ছে। অনেক বেলা হয়ে গেলেও ঠিকমতো রোদ ওঠেনি। পুব আকাশে জমে থাকা সাদা মেঘের আস্তরণ সরাতে সরাতে মৃদু উত্তাপ আর ঔজ্জ্বল্যে একটু একটু করে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে সূর্য্য।
আধা পাকা রাস্তা কাদা-জলে ভরে আছে। সুন্দর কাদাজল এড়িয়ে নদীর দিকে হাঁটা শুরু করে। বেশ খানিকটা পথ যাওয়ার পর সুন্দর ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করলো। ব্যথার তীব্রতা বাড়তেই সে হাঁটা বন্ধ করে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো উপড়ে যাওয়া নখের কোণা থেকে গলগলিয়ে রক্ত পড়ছে। সে হাত দিয়ে চেপে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করলো কিন্তু রক্তপড়া বন্ধই হচ্ছেনা। সুন্দর চারপাশ দেখলো রক্তপড়া বন্ধ করার জন্য কিছু পাওয়া যায় কিনা। রাস্তার ডানপাশে তাঁকাতেই চোখে পড়লো বিস্তৃত দূর্বা ঘাসের সারি। বৃষ্টিজলে সিক্ত দূর্বাগুলো সূর্য্যের উজ্জ্বল আলোতে চিকচিক করছে। সুন্দর বেশ কয়েকটি দূর্বা ছিড়ে নিলো। হাতের তালুতে রেখে জোরে জোরে ঘষতে লাগলো। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর দূর্বা থেকে কালচে সবুজ রস বেরুলো। সেই রস নখের কোণে লাগাতে চিনচিনে ব্যাথাটা আরো তীব্র হয়ে জায়গাটা জ্বলতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর চিনচিনে ভাবটা কমে এলো। রক্ত পড়াও বন্ধ হয়ে গেলো।
সুন্দর ঝাউতলার কাছাকাছি পৌছে দেখলো মালেক আর সুজয় বসে আছে। সুন্দরকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটতে দেখে সুজয় বলে, কি রে পায়ে কি হয়েছে?
সুন্দর এলো চুল ঠিক করতে করতে বলে, আর বলিস না, ঘর থেকে বেরুনোর সময় দরজায় লেগে নখ ওঠে গেছে।
মালেক জিজ্ঞেস করে, পায়ে লাগিয়েছিস কিছু?
সুন্দর মাথা নেড়ে বলে, দূর্বার রস লাগিয়েছি। এখন ব্যাথাটা কমেছে।
সুন্দর মালেককে জিজ্ঞেস করে, বাড়ি থেকে কখন বেরিয়েছিস?
মালেক বলে, তা প্রায় ঘন্টাখানেক তো হবেই।
সুন্দর বলে, তোর খুঁজে তোদের বাড়িতে গিয়েছিলাম।
মালেক ভ্রু কুচকে বলে, এই অধম বান্দাকে হঠাৎ খোঁজার হেতু কী জনাব?
সুন্দর বলে, কেন আমি গ্রামে থাকলে কি তোর খুঁজ নেইনা?
মালেক বলে, তাই বলেছি নাকি!
সুন্দর বলে, তোদের বাড়ির পাশ দিয়েই আসছিলাম। ভাবলাম তোকে নিয়ে আসি। কিন্তু এখন দেখি তুই আমার আগেই চলে এসেছিস।
মালেক সুন্দরকে ধরে ঝাউতলায় বসায়। তারপর স্বহাস্যে বলে, গতরাতে আমাদের বাড়িতে একটা মেয়ে এসেছে। দেখতে যা সুন্দর! কি বলবো! এমন সুন্দরী মেয়ে আমি এই তল্লাটে আর একটি দেখিনি। মেয়েটির চোখের দিকে তাঁকাতেই কেমন জানি লাগে।
সুন্দরের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ফর্সা মুখ রাগে খানিকটা লালচে দেখায়। মালেকের মুখে মেয়েটার কথা শুনতে ওর ভালো লাগছেনা। মালেকের কথার ধরণে মনে হচ্ছে সেও মেয়েটিকে পছন্দ করে ফেলেছে। সুন্দর রাগে কোন কথা বলেনা।
সুজয় দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে, এতো সুন্দর নাকি মেয়েটা!
মালেক আফসোসের সুরে বলে, দেখলেই বুঝতে পারবি। একেবারে ডানাকাটা পরী। আমার তো ইচ্ছে করছে মেয়েটিকে এক্ষুনি প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে দেই। কিন্তু তা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছেনা।
সুন্দর এবার নড়েচড়ে বসে। আনন্দিত স্বরে জিজ্ঞেস করে, সম্ভব হবেনা কেন?
মালেক মলিন মুখে বলে, আমার পরিবার কোনদিন হিন্দু মেয়েকে মেনে নেবেনা। তাই প্রেমের প্রস্তাব দিয়েও লাভ হবেনা।
সুন্দরের মুখটা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে। মালেকের ওপর জমা ক্ষণিকের রাগ মিইয়ে যায়। সুন্দর সব জেনেও মালেককে জিজ্ঞেস করে, ওই হিন্দু মেয়েটা তোদের বাড়িতে আছে নাকি?
মালেক বলে, না , কাল রাতেই সন্তোষ জেঠার বাসায় চলে গেছে। তারপর আনন্দিতস্বরে বলে ওঠে, তোদের কেউ ইচ্ছে করলে মেয়েটার সাথে প্রেম করতে পারিস। বন্ধুর প্রেম দেখে দুধের স্বাদ না হয় ঘোলে মেটাবো।
মালেকের কথা শেষ হবার আগেই সুজয় বলে, আমি বাপু এসবে নেই। একটা সামাল দিতেই প্রাণ বের হয়ে যাচ্ছে। নতুন আরেকটা নিয়ে বিপদে পড়তে চাইনা। তার চেয়ে এই কিউট বয় সুন্দরকে বল প্রেম করতে।
কথাটি শুনে অনেকক্ষণ পর সুন্দরের মুখে মৃদু হাসি ফুটে। লজ্জ্বিত ভঙ্গিতে বলে, আমাকে দিয়ে প্রেম-ট্রেম হবেনা। প্রেম করার মতো যে পার্সোনালিটি প্রয়োজন তা আমার নেই, আমার দ্বারা এসব হবেনা।
মালেক ব্যঙ্গ করে বলে, ওলে ওলে ছোট সোনা তোমাকে দিয়ে হবেনা না! যা একখানা চেহারা বানিয়েছো মেয়েরা তো তোমার প্রেমে এমনিতেই লুটোপুটি খাবে।
সুজয় বলে, চল একবার দেখে আসি মেয়েটাকে।
মালেক সুজয়ের কথায় একমত হয়ে সুন্দরকে জিজ্ঞেস করে, যাবি নাকি? চল ঘুরে আসি।
সুন্দর এতোক্ষণ থেকে মনে মনে এটাই চাইছিলো কিন্তু লজ্জ্বায় আগ বাড়িয়ে বলতে পারছিলোনা। কাজেই যাওয়ার কথা শুনে মন আনন্দে ভরে উঠলো। সেই সাথে একটু নার্ভাসও লাগছিলো।
ঝাউতলায় অনেকক্ষণ আড্ডা চললো। সূর্য্য যখন ঠিক মাথার উপর তখন ওরা সন্তোষ বাবুর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলো।
বাঁশ আর বেতের বেড়া দিয়ে পুরো বাড়িটা ঢাকা। উঠোনে শুকাতে দেয়া হয়েছে কালাইয়ের বড়ি। বারান্দায় শুয়ে আছে একটি কুকুর। উঠোনজুড়ে দুটি রাজহাঁস প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুন্দর, মালেক ও সুজয় উঠোনে আসতেই রাজহাঁস দুটি গলা নিচু করে তাদের দিকে তেড়ে এলো। যা যা বলে সুজয় রাজহাঁসগুলোকে তাড়িয়ে দেয়। হাঁসগুলো সরে যেতে মালেক গলা তুলে হাঁক দেয়, জেঠা বাড়িতে আছেন নাকি?
মুখভর্তি পান নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সন্তোষ বাবুর স্ত্রী। বাইরে এসেই বারান্দার কোণে চিক করে পানের পিক ফেললেন। পিকের একটু ছিটে কুকুরটার উপর পড়তেই কুকুরটি হকচকিয়ে জেগে ওঠলো। খানিকটা ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে সুন্দরদের দিকে তাঁকালো। বার দুয়েক ভেউ ভেউ আওয়াজ করে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।
সন্তোষ বাবুর স্ত্রী স্বহাস্যে বলেন, আরে তোমরা যে! অনেকদিন পর তোমাদের দেখছি!
মালেক বলে, এইতো জেঠি একটু ব্যস্ততা থাকায় এদিকে আসা হয়না। আজ এদিকে যাচ্ছিলাম ভাবলাম দেখা করেই যাই।
সন্তোষ বাবুর স্ত্রী বলেন, তোমাদের জেঠা বের হয়ে গেছেন। তোমরা ঘরে এসে বসো। বলেই তিনি রাস্তা করে দেন। মালেক, সুজয় খুশী খুশী মুখে ঘরে ঢুকে। সুন্দর ঘরে ঢুকতে সাহস পাচ্ছিলোনা। তার বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে। এখান থেকে পালাতে পারলেই সে বাঁচে! কিন্তু ঘরে না যাওয়াটা খারাপ দেখায় তাই সে গুটিপায়ে ঘরে ঢুকলো।
ঘরে ঢুকে মালেক বলে, জেঠি এক গ্লাস পানি খাওয়ান। বড্ড পিপাসা পেয়েছে।
সন্তোষ বাবুর স্ত্রী পানি আনতে পাশের ঘরে চলে যান। কিছুক্ষণ পর পানি নিয়ে ফিরে আসেন। সেইসাথে প্লেটে করে নিয়ে আসেন নারকেল ও মুড়ির নাড়ু। জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলেন, তোমরা তো এদিকে আসোই না। সুন্দর বাড়িতে কবে আসলে?
সুন্দর মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে, এসেছি বেশ কয়েকদিন হয়ে গেছে। কলেজে ছুটি চলছে তাই চলে এলাম।
সন্তোষ বাবুর স্ত্রী আবার বলেন, তোমার বড়দি কেমন আছে?
সুন্দর বলে, বড়দি ভালো আছে। সেও গতকাল এসেছে।
সন্তোষ বাবুর স্ত্রী বলেন, তাই নাকি? ওকে বলো আমাদের বাড়িতে আসতে।
সুজয় নারকেলের নাড়ু চিবুতে চিবুতে বলে, জেঠি সীমা, রুমা আর মিঠুনকে দেখছি না যে, ওরা কোথায়?
মিঠুনের গতরাত থেকে জ্বর এসেছে। পাশের ঘরে শুয়ে আছে। তোমরা বসো, আমি ওকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। বলেই তিনি চলে গেলেন।
সুন্দর বাইরের দিকে তাঁকিয়ে আছে। তার দু-চোখ মেয়েটিকে খুঁজে ফিরছে। কিন্তু কোথাও মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছেনা। যার জন্য এখানে আসা তাকে না দেখতে পেয়ে ওর ভীষণ অস্বস্তি লাগছে।
সুজয় ওর ছোট্ট ট্রানজিস্টার চালু করে। অনেক চেষ্টা করেও কোন রেডিও স্টেশন ধরতে পারছিলোনা। টিউনিং করতে করতে সে বারান্দায় চলে এলো। অনেক চেষ্টার পর বেতার হতে খসখসে কন্ঠ ভেসে এলো, “বেলা একটায় এক ঘোষনায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ ঢাকার রাজপথে নেমেছে। হোটেল পূর্বানীতে শেখ মুজিবুর রহমান কনফারেন্স ডেকেছেন। হোটেল পূর্বানীর আশপাশের সব রাস্তায় হাজার ষাটেক বিক্ষুব্ধ জনতা বাঁশ, লাঠি আর লোহার রড নিয়ে অবস্থান নিয়েছে। কয়েকজন বিক্ষুব্ধ লোকের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্টের এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিবেন না। তারা এখন শেখ মুজিবের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন।
বিপ বিপ করে রেডিও সিগনাল হারিয়ে গেলো। সুজয় বিরক্ত হয়ে পেছন ফিরতেই দেখলো ওর পেছনে সুন্দর, মালেক আর মিঠুন দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখই আরক্ত। সবার মুখমন্ডলে একটা চাপা ক্ষোভ।
সুন্দর বললো, এটা কোন রেডিও স্টেশন ছিলোরে?
সুজয় দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে বলে, বোঝার আগেই তো সিগনাল হারিয়ে গেলো।
সুন্দর উত্তেজিত স্বরে বলে, ঘটনা সত্যিই মনে হচ্ছে। আমি এমন কিছু একটাই আন্দাজ করেছিলাম।
মালেক বলে, শেখ মুজিব স্পষ্ট বলে দিয়েছেন তিনি ছয়দফার কথা বলে ভোট পেয়েছেন। কাজেই দেশের শাসনতন্ত্র রচিত হবে ছয়দফার ভিত্তিতে, দেশ পরিচালিত হবে ছয়দফার ভিত্তিতে। কিন্তু শালার ইয়াহিয়া যে, কোনভাবেই ছয়দফা মেনে নিবে না তা আজ প্রমাণ হয়ে গেলো।
সুন্দর বলে, পশ্চিম পাকিস্তানী বেনিয়ারা একেবারে পাগলা কুকুর হয়ে গেছে। প্রতিদিন শতশত মানুষ নির্বিচারে গুলি করে মেরেও তাদের শান্তি হচ্ছেনা। এই অধিবেশন স্থগিতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ইয়াহিয়া শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেবেনা।
মিঠুন বলে, আমি কিছু একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছি।
সুন্দর বলে, হ্যাঁ আমারও সেরকমটি লাগছে। আমার মনে হচ্ছে জুলফিকার আলী ভুট্টো ইয়াহিয়াকে প্রভাবিত করছে। ওই শালা ভুট্টো কম সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। ও ইয়াহিয়াকে উলটাপালটা বুঝিয়ে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে।
মালেক বলে, এই ভুট্টো জানোয়ারটা আইয়ুব খানের আমলে মন্ত্রী থাকা অবস্থা হতে এখন পর্যন্ত বাঙ্গালীদের ভোগাচ্ছে।
একটু দম নিয়ে মালেক আবার বলে, কসম আল্লার, এইবার ইয়াহিয়া এদিক-সেদিক কিছু করলে খবর আছে। ৪৭ থেকে শুরু করে গত ২৪ বছর অনেক শোষন করেছে। আর শোষিত হতে চাইনা।
সুন্দর বলে, এটা মগের মুল্লুক নয়। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। নিয়ম অনুসারে জনগনের ম্যান্ডেট নিয়ে আওয়ামীলীগই সরকার গঠন করবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রহমানের কাছে ইয়াহিয়াকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতেই হবে।
সুজয় পাশ থেকে বলে, বন্ধু এটা হচ্ছে স্বৈরশাসক ইয়াহিয়ার মুল্লুক। ওদের যা ইচ্ছে হবে তাই করবে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা কোনদিনই’বা ন্যায়নীতিকে পাত্তা দিয়েছে। ন্যায়নীতিকে যদি পাত্তাই দিতো তবে সাত কোটি মানুষের ভাষা বাংলাকে পাশ কাটিয়ে উর্দুকে কখনো রাষ্ট্রভাষা করতো না। বাঙ্গালীদের ওরা কোনদিন মানুষই মনে করেনি।
মিঠুন বলে, ডাকাতের বাচ্চাগুলো পূর্ব পাকিস্তানের টাকা দিয়ে ফূর্তি করবে আর এ অঞ্চলের মানুষ না খেয়ে মরবে।
মালেক বলে, দেখ গত বছরের ঘূর্ণিঝড়ে এতো এতো মানুষ মারা গেলো অথচ সরকার কোন গুরুত্বই দিলোনা। আসলে আমরা ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো অবহেলিত।
সুন্দর বন্ধুদের অভয় দিয়ে বলে, আরে তোরা এতো সিরিয়াস হচ্ছিস কেন! কোন চিন্তা করিস না। দেখিস ইয়াহিয়া খান আবার অধিবেশন ডাকতে বাধ্য হবে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা মুখে যাই বলুক ওরা জানে বাঙ্গালীরা ইচ্ছে করলে কি করতে পারে! উনসত্তরে আইয়ুব খান বাঙ্গালীদের তেজ টের পেয়েছে। এবার উল্টাপালটা কিছু করলে ইয়াহিয়া টের পাবে বাঙ্গালী কাকে বলে এবং উহা কতো প্রকার ও কি কি?
সুন্দরের কথা বলার ধরণ দেখে মালেক, সুজয় ও মিঠুন হেসে ফেলে। সুন্দর সুজয়কে বলে, তুই রেডিওতে খেয়াল রাখিস শেখ মুজিব কি বলেন। আমি এখন বাড়ি যাচ্ছি। কথাগুলো বলেই সে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়।


কালো কাঠের পাঠাতনে ঢাকা কার্নিশে ঝুলছে একটি ছোট্ট লোহার শিকল। তমা বিছানায় শুয়ে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে সেদিকে। ঘরের দেয়ালসহ সবকিছুই কাঠের তৈরী। এককালে ভুমিকম্পের ভয়ে এ অঞ্চলে কাঠের ঘর বেশী বানানো হতো। কাঠের ঘরের আলাদা সৌন্দর্য্য আছে। দরজা-জানালাগুলো বেশ কারুকার্যময়। জীবনে এই প্রথমবারের মতো তমা কাঠের ঘরে থাকছে। দুটো ঘরই ওর খুব পছন্দ হয়েছে। শুধু অনেকদিন অব্যবহৃত থাকায় মেঝেগুলো শ্যাওলা জমে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে। খালি পায়ে মেঝেতে হাটতে গেলে গা ঘিনঘিন করে। তমা গত দুদিন থেকে চেষ্টা করেও মেঝের শ্যাওলা ভালো করে ছাড়াতে পারেনি। তমার ঘষামাজা দেখে ওর মা বললেন কয়েকদিন গেলে ওগুলো এমনিতেই উঠে যাবে।
হঠাৎ করে কার্নিশ থেকে কি একটা গুড়ো তমার চোখে পড়লো। সাথে সাথে ওর দুচোখ ভীষণ জ্বলা শুরু হলো। মুহূর্ত্বেই তমার চোখদুটো পুরো লাল হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে রক্তের সমস্ত হিমোগ্লোবিন চোখে এসে জমা হয়েছে। সে কোনরকমে ঘর থেকে বের হয়ে পুকুরঘাটে আসলো। অনেকক্ষণ পানি দেয়ার পর ধীরে ধীরে চোখজ্বলা কমতে লাগলো। তমা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে গিয়ে বুঝতে পারে চোখ বেশ ফোলে গেছে।
হঠাৎ পেছন থেকে আওয়াজ পাওয়া গেলো, তমাদি এ সময়ে পুকুরে কি করছো?
তমা পেছন ফিরতে দেখলো সীমা দাঁড়িয়ে রয়েছে। লালচে চোখে তমা সীমাকে দেখে নিলো। সীমা ওর থেকে বড়জোর বছর খানিক ছোট হবে। বয়সের অল্প ব্যবধান সত্ত্বেও সীমা মুখভরে ওকে তমাদি বলে ডাকে। মাত্র তিনদিনের পরিচয়েই সীমা ও রুমা ওকে আপন করে নিয়েছে।
তমার লালচে ও ফোলা চোখে চোখ পড়তেই সীমা বলে, এ কী! তোমার চোখে কি হয়েছে? এ যে একেবারে লাল করে ফেলেছো!
তমা মুচকি হেসে বলে, আর বলোনা, ঘরের ছাদ থেকে কি একটা চোখে পড়েছে।
সীমা বলে, চোখে জল দিয়েছো?
তমা বলে, হ্যাঁ দিয়েছি। এতোক্ষণ মনে হচ্ছিলো কে যেন চোখে মরিচ মেখে দিয়েছে। এখন বেশ ভালো লাগছে।
সীমা বলে, ভালো করেছো। তারপর ঘরে একা বসে কি করছো?
তমা বলে, কিছুনা, একটা বই পড়ার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু মন বসছেনা।
সীমা বিষ্ময়ের সাথে বলে, বাব্বা তোমরা এতো বই পড়তে পারো! আমার বাবা বই পড়ার মতো এতো ধৈর্য্য নেই।
তমা কিছু বলেনা। শুধু মৃদু হাসে। সীমা বলে, বই পরে পড়তে পারবে। এখন চলো একটু ঘুরে আসি।
তমা মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানালো। হাত দিয়ে শাড়ি ঠিক করে নিলো। পুকুরের স্বচ্ছ কালোজলে একবার মুখ দেখে নিলো। পানিতে বেশ স্পষ্টই মুখ ভেসে ওঠেছে। পানির দিকে তাঁকিয়েই সে মাথার চুল ঠিক করে নিলো।
আলের দু-পাশে বাতাসের তালে ঢেউ খেলছে ধানের শিষ। আর মাস খানেক পরেই ঘরে ঘরে উঠবে বোরো ধান। তাই কৃষকরা শেষ মুহূর্ত্বের পরিচর্যা সেরে নিচ্ছে। ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে যাওয়ার সময় আধা পাকা ধানের গন্ধে মনটা বেশ ভালো হয়ে যায়। ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ পাশের খোলা মাঠে চোখ পড়তেই সুন্দর দাঁড়িয়ে পড়ে। মাঠের সুউচ্চ নারকেল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুটো অস্পষ্ট ছায়া। দূর থেকে ছায়ামানবীগুলোকে ঠিক চেনা যাচ্ছিল না। সে মাঠের দিকে এগিয়ে যায়। বেশ খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর মেয়ে দুটিকে খুব চেনা মনে হয় সুন্দরের। আরেকটু এগিয়ে যেতেই বুঝতে পারে উজ্জ্বল শ্যামলা রঙের যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে রয়েছে সে সন্তোষ বাবুর ছোট মেয়ে সীমা। অন্য মেয়েটির দিকে চোখ পড়তেই সুন্দরের বুকটা ফাঁকা হয়ে যায়। মনে হয় কে যেন হঠাৎ করে বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বেলুনের বাতাস টুস করে ছেড়ে দিয়েছে।
সুন্দর যেন এক ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যায়। সে আর সামনে এগুতে সাহস পায়না। স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তার ঘোর কাটে সীমার ডাকে। সীমা সুন্দরের দিকে এগিয়ে বলে, কি ব্যাপার সুন্দর দা, ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? সুন্দর আমতা আমতা করে বলে, না মানে এদিকেই যাচ্ছিলাম।
সীমা সুন্দরকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে, তমা দি, এই হচ্ছে আমাদের গ্রামের সবচাইতে মেধাবী ছাত্র সুন্দর দা। এই প্রথম সুন্দর তার হৃদয়েশ্বরীর নাম জানতে পারলো।
তমা সীমাকে বললো, আমি উনাকে চিনি। উনিই তো সেদিন আমাদের গ্রামের রাস্তা দেখিয়ে এনেছেন।
সীমা চিমটি কেটে বলে, তাইতো বলি তুমি কেনো বারবার ওদিকে তাকাচ্ছিলে, আর সুন্দর দা’ও কেনো এতো জায়গা থাকতে এদিকে এলো! সীমার কথায় তমা ও সুন্দর দুজনেই বেশ লজ্জ্বা পায়।
সুন্দর লজ্জ্বার হাসি হেসে বলে, সীমা তুই এতো ফাজিল হলি কবে থেকে?
সীমা কিছু বলেনা। বেশ খানিকটা সময় নীরব থাকার পর তমা বলে, সেদিন আপনি আমাদের কষ্ট করে পৌছে দিলেন অথচ আপনাকে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দেয়া হয়নি।
সুন্দর লজ্জ্বাবনত মুখে বলে, না ঠিক আছে, এটা আমার কর্তব্য ছিলো।
পাশ থেকে সীমা বলে উঠে, তা সুন্দর দা তুমি কবে থেকে এতো কর্তব্যপরায়ন হয়ে উঠলে! না কি সুন্দরী মেয়ে দেখে কর্তব্যবোধ জেগে উঠেছে! এ কথা বলে সীমা জোরে জোরে হাসতে লাগলো। সীমার হাসির গগনবিদারী ঝংকার চারপাশের সব নিস্তব্ধতা ভেদ করে সারা মাঠে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে চারদিকে ফিরতে লাগলো। ফসলের মাঠে কর্মরত কৃষকেরাও অবাক হয়ে এদিকে তাঁকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছে এখানে কি ঘটছে!
খানিকটা রাগতস্বরে সুন্দর বলে, সীমা এসব কি হচ্ছে?
সীমা ওড়না দিয়ে মুখ চেপে বলে, না এমনিতে মজা করছিলাম।
সীমার হাসি থামতেই নীরবতার কোমল আস্তরনে ঢাকা পড়ে প্রকৃতি। প্রকৃতির এ নীরবতা ভাঙ্গে সুন্দর। সে তমাকে জিজ্ঞেস করে আমাদের গ্রাম কেমন লাগছে?
তমা মিষ্টি হেসে বলে, হু অনেক ভালো লাগছে। এখানে আসার আগে চিন্তাই করতে পারিনি এমন সুন্দর একটা জায়গায় আমরা আসবো।
সুন্দর মৃদু হেসে বলে, বুঝতে হবে এটা আমাদের গ্রাম। ভালো না লেগে উপায় আছে! তারপর সীমার মাথায় একটা চাটি দিয়ে বলে, তাই নারে সীমা?
মাথায় চাটি দেয়ায় সীমা কপট রাগ দেখায়। গোমড়া মুখে বলে, আমি জানিনা।
সুন্দর বলে, এই তুই কিছু না বললে আমাদের গ্রামের মান-সম্মান আর কিছু থাকবেনা।
সীমা তারপরও কিছু না বলে মুখভার করে দাঁড়িয়ে থাকে। সীমার অভিমান দেখে তমা মুচকি হেসে সুন্দরকে বলে, না না এটা আপনার ঠিক হয়নি। বেচারী ভীষণ মন খারাপ করেছে।
সুন্দর মৃদু হেসে বলে, সীমার এ অভিমান অল্পক্ষণের জন্য। দেখবেন একটু পরেই আবার হাসি-খুশী। এ পাগলিকে আমি ভালো করেই চিনি।
সীমা সুন্দরকে ভেংচি কেটে বলে, কচু চিনো আমাকে! দেখবে আজ তোমার সাথে আর একটি কথা বলি নাকি!
সুন্দর হাসতে হাসতে বলে, আচ্ছা দেখবো তাহলে!
ওরা তিনজন সামনে এগুতে থাকে। সেদিন সন্ধ্যায় তমাকে শেষবারের মতো দেখেছিলো সুন্দর। মাঝখানে এ কটা দিন তমাকে দেখতে না পেয়ে ওর মনটা ভীষণ ছটফট করেছে। আসলে কার কখন কাকে ভালো লেগে যায় তা বোধহয় স্বয়ং স্রষ্টাও বলতে পারেননা। আজ থেকে কয়েকদিন আগেও সে তমাকে চিনতো না অথচ আজ এই মেয়েটার মায়াজালে সে ধরা খেয়েছে। গত কয়েকদিন অনেক চেষ্টা করেও সে তমার দেখা পায়নি। আজ হঠাৎ এই খোলা মাঠে দেখা হয়ে গেলো।
কথা বলার ফাঁকে সুন্দর আড়চোখে তমাকে দেখে নেয়। আজ তমার চোখের কোন সামান্য লাল হয়ে আছে। সুন্দর প্রথম থেকেই লক্ষ্য করেছে তমার মুখমন্ডল থেকে সবসময় যেন একটা মিষ্টি ও মৃদু হাসি গড়িয়ে পড়ে। সুন্দর মায়ের কাছে শুনেছে হাসি হাসি মুখের মানুষ জীবনে অনেক সুখী ও ভাগ্যবান হয়। তমাকে সুখী ও ভাগ্যবান ভাবতে সুন্দরের বেশ ভালো লাগছিলো।
তমা সুন্দরের দিকে চাইতেই সুন্দর অপ্রস্তুতের মতো চোখ সরিয়ে নিলো। ব্যাপারটা তমার চোখ এড়ালোনা। সুন্দর নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনারা এর আগে কোথায় থাকতেন?
তমা উত্তর দেয়, আমরা আগে জৈন্তাপুরে ছিলাম। বাবার বদলীর চাকরি। এই ছোট্ট জীবনে যে কতো জায়গা ঘুরেছি তার হিসেব নেই!
সুন্দর বলে, তাহলে তো ভালোই। এই সুযোগে কতো জায়গা ঘুরে নিয়েছেন। নতুন জায়গা মানে নতুন অভিজ্ঞতা। অনেক নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয়। ব্যাপারটার মধ্যে এক ধরণের আনন্দবোধ আছে।
তমা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, ভালো না ছাই। নতুন জায়গাতে গিয়ে অনেক নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হয় ঠিকই কিন্তু তাদের সাথে ভালো করে পরিচিত হওয়ার আগেই আবার বদলী। তখন ভীষণ খারাপ লাগে।
সুন্দর বললো, হু এটা ঠিক বলেছেন।
সুন্দরের কথার মধ্যেই তমা জিজ্ঞেস করলো, আপনি কিসে পড়ছেন?
সুন্দর জবাব দেয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ফাইনাল ইয়ারে আছি। আপনি?
তমাকে খানিকটা বিষন্ন দেখায়। তারপর বলে, গতবছর উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছি। বাবার ইচ্ছে আরো পড়বো কিন্তু মা আমাকে একা শহরে পাঠাতে রাজী নন। তাই আপাতত পড়াশোনা বন্ধ আছে।
সুন্দর বলে, আপনার মা কেন যেতে দিচ্ছেন না?
তমা বিমর্ষবদনে বলে, কয়েক বছর আগে আমার বড়বোন পানিতে ডুবে মারা যায়। সেই থেকে মা আমাকে ও আমার ছোট ভাইকে চোখের আড়াল করতে চাননা। আমরা বেরিয়েছি অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। মা নিশ্চয় এতোক্ষণে অস্থির হয়ে গেছেন।
সুন্দর বললো, দুঃখিত আমি না জেনে আপনার মনে কষ্ট দিলাম। চলুন বাড়ির দিকে যাওয়া যাক।
কথা বলতে ব্লতে ওরা বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। তমার গুছানো আর বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা সুন্দরকে ভীষন আকৃষ্ট করে। ওর সাথে কথা বলে সুন্দর বুঝতে পারে তমা অনেক কিছু জানে। দেশের সমকালীন রাজনীতি আর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে তার যথেষ্ট ধারণা রয়েছে। ভাবনা-চিন্তার সীমা দেখে আন্দাজ করা যায় কার্ল মার্কস আর লেনিনের মতবাদও পড়ে ফেলেছে। কথা বার্তায় জীবনানন্দ ও সুকান্তের মিলিত প্রভাব চোখে পড়ে। কখনো মনে হয় রোমান্টিক আবার কখনো কখনো সুকান্তের মতো বিদ্রোহী। তমার প্রতি মুগ্ধ হয়ে সুন্দর মনে মনে আবৃত্তি করে,

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

তবে এখানে নাটোরের বনলতা সেনের স্থান দখল করে নিয়েছে আনন্দপুরের তমালিকা দেব।
কথা বলতে বলতে ওরা অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। সুন্দর তমা ও সীমাকে বাড়ির কাছাকাছি পৌছে দিলো।

শিক্ষিত মূর্খ মাহফুজুর রহমানের দেখা উচিত সিলেটের শিক্ষা-দীক্ষার ইতিহাস কতো পুরনো।

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট


বৃহত্তর সিলেটের চার জেলায় বন্ধ হয়ে গেছে এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজ এর সম্প্রচার। লন্ডনে প্রেস কনফারেন্সে এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান সিলেটের মানুষদের নিয়ে কটুক্তি করার প্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মাহফুজ প্রেস কনফারেন্সে বলেছে, আপনারা সিলেটিরা পড়াশোনা করে ভদ্র হয়ে গেছেন।

টাকা দিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি কেনা এই মাহফুজের জ্ঞানের পরিধি যে কতোটা সীমিত তা নিচের লেখাগুলো পড়লে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

দেশের এক প্রান্তে অবস্থিত বৃহত্তর সিলেটের শিক্ষা-দীক্ষার ঐতিহ্য অধুনাকালের নয়। অতি প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলের মানুষ পড়াশোনা করেছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেট শিক্ষাক্ষেত্রে ছিলো অগ্রসর জনপদ।

পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের ১৭টি জেলার মধ্যে ১৬টি জেলারই ডিসি ছিলেন সিলেটি। সারা পাকিস্তানের শিক্ষার হার ছিলো ১৭ ভাগ অথচ এর বিপরীতে সিলেটের শিক্ষার হার ছিলো ২৪ ভাগ। ব্রতচারী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ত্ব ব্রিটিশ আমলের আইসিএস অফিসার গুরুসদয় দত্ত ছিলেন সিলেটের সন্তান। এই সিলেটেরই সন্তান সৈয়দ মুজতবা আলী, মঞ্জুশ্রী চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত অধ্যাপক ড. জিসি দেব, বিখ্যাত ঐতিহাসিক নিহার রঞ্জন রায়,আসাম সরকারের শিক্ষামন্ত্রী আব্দুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া), কর্ণেল এম এ জি ওসমানি, সাবেক স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, দেশের প্রথম সারির অর্থনীতিবীদ সাবেক মন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এই সিলেটেরই সন্তান।

উইকির সাহায্য নিয়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সিলেটের ঐতিহ্যের বিশালতা দেখে আসি।

সিলেট একটি প্রাচীন জনপদ। প্রাচীন কাল থেকে বহু ভাষাভাষী জাতি, বর্ণ নিয়ে বেড়ে উঠেছে বাংলাদেশের প্রান্তবর্তি এই জনপদ। সিলেটে প্রাপ্ত তাম্রশাসন, শিলালিপি, কাহিনী, গাঁথা ইত্যাদি এই অঞ্চলের ভাষা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন বলে ধারণা করা হয়[৪]। এই অঞ্চলে প্রাচীন কাল থেকে অস্ট্রেলীয়, মঙ্গোলীয় প্রভৃতি সম্প্রদায়ের বসবাস, যার ফলে ভাষার বেলায়ও রয়েছে বৈচিত্র্য। বলা হয়, আর্যদের দ্বারা যখন ভারতের মূল ভূখণ্ড অধিকৃত হয়, বৌদ্ধরা তখন স্থান পরিবর্তন করে সিলেটে এসে বসবাস শুরু করে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আসদ্দর আলী সহ আরো অনেক গুনী জনেরা লিখেন খ্রিস্টের জন্মের অনেক পূর্বে সিলেট বৌদ্ধদের তীর্থে পরিণত হয়ে ছিল। যার ফলে সপ্তম শতাব্দীতে রচিত বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণের চর্যাপদে সিলেটের মানুষের কথ্য ভাষার অনেকটা মিল রয়েছে বলে জানা যায়[৪৪][৪৫]। ডঃ আহমদ শরিফ সহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার চর্যাপদের ভাষার সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রটি আজও অক্ষুন্ন আছে। উদাহরণ স্বরুপঃ- চর্যাপদে ব্যবহূত হাকম (সেতু) উভাও (দাঁড়াও) মাত (কথা) ইত্যাদি [৮]। অতঃপর খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দিতে সিলেটে সংস্কৃত মিশ্রিত বাংলা লিপির বিকল্প লিপি হিসেবে সিলেটি নাগরী নামে একটি লিপি বা বর্ণমালার উদ্ভাবন হয়। সিলেটি নাগরী লিপি এবং এ লিপিতে রচিত সাহিত্যকে (সিলেটি) বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন স্বরুপ গণ্য করা হয়। উল্লেখ্য, সিলেটি নাগরী লিপিতে রচিত সাহিত্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এযাবৎ ডক্টরেট করেছে ডঃ গোলাম কাদির, ডঃ আব্দুল মছব্বির ভুঁইয়া ও ডঃ মোহাম্মদ সাদিক[৪]। সুলতানী আমলে সিলেটের মরমী কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে নাগরী লিপির ব্যবহার যদিও খুব বেশী ছিল। বর্তমানে তা একেবারে হাড়িয়ে যায়নি। এ লিপিতে রচিত হালতুন নবী পুথিঁকেই সিলেটের শ্রেষ্ট কাব্য সমুহের অন্যতম মনে করা হয়[৪]। সৈয়দ মোস্তফা কামলের মতে সিলেট বিভাগের অধিবাসীরা সাহিত্য চর্চায় বাংলাদেশের পথিকৃৎ। এ বিভাগের অধিবাসীরা বাংলা ভাষা ও সিলেটি নাগরী ভাষা সহ মোট সাতটি ভাষায় সাহিত্য চর্চার ঐতিহ্য রেখেছেন। পনের’শ শতাব্দি শুরু থেকে এ যাবৎ সিলেটবাসীরা যে সমস্ত ভাষায় সাহিত্য রচনা করে গেছেন, সেগুলো হলো-(১) সংস্কৃত (২) বাংলা (৩) সিলেটি নাগরী (৪) আরবী (৫) ফার্সী (৬) উর্দু ও (৭) ইংরেজি।[৪] উদাহরণ স্বরুপ বিভিন্ন ভাষায় রচিত সিলেট গীতিকায় অন্তর্ভূক্ত সিলেট অঞ্চলের লোক সাহিত্যকে বুঝানো হয়।

প্রখ্যাত সাহিত্য গবেষক অধ্যাপক আসদ্দর আলী, সৈয়দ মুর্তাজা আলী প্রমুখ গণের মতে মধ্য যুগে সিলেটি নাগরী, আরবী ও ফার্সী ভাষা ছিল সিলেটের অধিবাসীর অন্যতম অবলম্বন। উল্লেখিত ভাষায় রচিত কাব্য গ্রন্থ, ধর্মীয় কিতাব, গীত-গাঁথা, ডাক-ডিঠান ইত্যাদি সিলেটের সাহিত্য ভাণ্ডারকে সম্মৃদ্ধ করেছে। বলা হয়, আধুনা যুগে যদিও ঐ সব ভাষার একক প্রচলন নাই, তবে বাংলা ভাষার শব্দ ভাণ্ডারে আরবী, ফার্সী উর্দু ইত্যাদি ভাষার সংমিশ্রণ রয়েছে [৪][৮]। বর্তমান যুগে সিলেটের অধিবাসী সকলেই বাংলা ভাষায় লেখাপড়া করছেন এবং আঞ্চলিক ভাবে প্রায় সকলেই সিলেটি ভাষায় কথা বলেন।

শিক্ষা

বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণরাই এককভাবে হিন্দু সমাজের শিক্ষা গুরু হিসেবে বিবেচিত হতেন। ভাটেরায় প্রাপ্ত তাম্রফলকের বিশেষ বিবরণে রাজকীয় শিক্ষা প্রসার ও যজ্ঞ উপলক্ষ্যে মিথিলা ও কৌনুজ হতে সিলেট অঞ্চলে ব্রাহ্মণ আনয়নের উল্লেখ পাওয়া যায়।[২] তখনকার সময়ে সিলেট অঞ্চলের পঞ্চখণ্ড, রাজনগর, গোলাপগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে টোল ও চতুষ্পাঠীতে ছাত্ররা গুরুগৃহে শিক্ষা নিত। উল্লেখিত টোল জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষা গ্রহণ করে সিলেট হতে যারা ভারতবর্ষে সুনাম অর্জন করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমনি। উপমহাদেশের বিখ্যাত জ্ঞানপীঠ নবদ্বীপ পর্যন্ত রঘুনাথ শিরোমনি প্রসিদ্ধ ছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায় [২]। শিক্ষা বিষয়ে তত্কালে নবদ্বীপে সিলেটিদের নিয়ে একটি প্রবাদবাক্য প্রচলিত ছিল বলে বলা হয়, শ্রীহট্টে মধ্যমা নাস্তি অর্থ সিলেটের লোক হয় উত্তম, নয় অধম, মধ্যম নেই। বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্যের পিতা জগন্নাথ সহ আরো অসংখ্য পণ্ডিতজনের এই অঞ্চলে জন্ম হয়।[৮] অতপর হিন্দু বৌদ্ধ যুগের পরে মুসলিম যুগেও সিলেট অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ঘটে। সুফী, দরবেশ ও মাশায়েখগণ যখন সিলেট আসেন তখন ভক্ত অনুরুক্তদের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছিয়ে দিতে খানকা প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীকালে ঐ খানকাগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রুপান্তর হয় বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন শুধু সংস্কৃত নয় উর্দু, পারসী ও আরবী ভাষায় বিদ্বান হয়েছেন অনেক। বিদ্বানদের মধ্যে যাঁরা শিক্ষা প্রসারের কাজে করে স্থাপনা, সাহিত্য চর্চাসহ বিভিন্নভাবে জায়গা জমি দিয়ে সহযোগিতা দান করে গেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য মধ্য যুগের মহাকবি সৈয়দ সুলতান, সৈয়দ মুসা, শেখ চান্দ, সৈয়দ শাহনুর, কবি প্যারিচরণ, গীরিশ চন্দ্র নাগ, গৌরিশংকর, লীলা নাগ, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, অধ্যাপক আসদ্দর আলী, অধ্যাপক আজফর আলী, দেওয়ান হাসন রাজা, শেখ ভানু, শিতালং শাহ, আসিম শাহ, রাধা মাধব দত্ত, রাধা রমন দত্ত, শাহ ইস্কন্দর মিয়া, ডঃ সুন্দরী মোহন, এম এ জি ওসমানী, গজনফর আলী, চৌধুরী গোলাম আকবর।[৮][২][৪][৪৬] উল্লেখিত ব্যক্তিদের যাদের প্রচেষ্টায় এ অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। এসবের মধ্যে, রাজনগর এম ই স্কুল (স্থাপিতঃ ১৮৬৬ইং) সিলেট মিশনারী এস ই স্কুল (স্থাপিতঃ ১৮৮৭ ইং) সুনামগঞ্জ জুবিলী হাই স্কুল (স্থাপিতঃ ১৮৮৭ইং) মৌলভীবাজার হাই স্কুল (স্থাপিতঃ ১৮৯১ইং) সুনামগঞ্জ দশরথ এম ই স্কুল (স্থাপিতঃ ১৮৯৬ইং) হবিগঞ্জ হাই স্কুল (স্থাপিতঃ ১৮৯৭ইং) সিলেট গার্লস স্কুল (স্থাপিতঃ ১৯০৩ইং) পাইল গাও ব্রজনাথ হাই স্কুল, জগন্নাথপুর (স্থাপিতঃ ১৯১৯ইং) ইত্যাদি। ১৮৬৭ সালে সিলেট বিভাগে স্কুলের সংখ্যা ছিল ২৮টি এবং ১৯০৫ সালে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৯টিতে। যার মধ্যে বর্তমান মৌলভীবাজার জেলায় ১৩টি মাধ্যমিক, সুনামগঞ্জ জেলায় ১৩টি মাধ্যমিক, হবিগঞ্জ জেলায় ১৮টি মাধ্যমিক এবং সিলেট জেলায় ১৫টি মাধ্যমিক স্কুল ছিল । ১৮৬৫ সালে এই বিভাগ থেকে গ্র্যাজুয়েট ছিলেন মোহাম্মদ দাইম এবং জয় গোবিন্

ইতি প্রেমাংশু

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট


প্রিয়তমেষু,

আজ সকাল থেকেই ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষার এই সময়টাতে অবিরাম বৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও কোন এক অদৃশ্য কারনে গত সপ্তাহখানেক একফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি। এটা কি শুধুই প্রকৃতির বে-খেয়াল নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝা মুশকিল! সে যে কারনই হোক আজ কিন্তু মনের মতো করে বৃষ্টি হচ্ছে। ঝিরঝির বৃষ্টির তালে তালে প্রায়ই নেচে উঠছে মানকচুগুলো। হলুদ কৃষ্ণচূড়ার গাছটিও অদ্ভুত ছন্দে দুলছে। আজ বৃষ্টি সকালে বৃষ্টি দেখে ভেবেছিলাম ক্যাম্পাসে যাবো কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ইচ্ছে করলোনা। মনে আছে ক্যাম্পাসের বৃষ্টিভেজা দূর্বাঘাস তুমি কত্তো পছন্দ করতে? জুতোজোড়া দূরে ফেলে আলতা রঙে রাঙ্গানো পা মেলে ছুটে চলতে দূর্বা মাড়িয়ে। তোমার নিশ্চয় মনে আছে ক্যম্পাসের সেই কদম গাছটির কথা। সৌন্দর্য্যহানির দোহাই দিয়ে কর্তৃপক্ষ সেই গাছটি কেটে ফেললো এই ক’দিন আগে। সত্যি বলতে কি গাছটা এমন এক অবস্থানে ছিলো যে আমারও দেখতে ভালো লাগতোনা। কিন্তু এই কদম গাছটিকে তুমি এতোটাই ভালোবাসতে যে আমি সাহস করে এই অপছন্দের কথা কখনো বলতে পারিনি। ছোট্ট হলুদ বলের মতো দেখতে ওই ফুলে তুমি কি যে খুঁজে পেতে তা আমার কাছে আজও রহস্য! আমার প্রায়ই মনে হতো তুমি আমার চেয়ে ওই কদম গাছকেই বেশী ভালোবাসতে। ঝুম বৃষ্টিতে তুমি যখন ওই গাছ পানে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে তখন আমার দারুন হিংসে হতো। মনে হতো একটা সাধারণ উদ্ভিদ আমার ভালোবাসায় ভাগ বসাচ্ছে! তখন ইচ্ছে হতো গাছটি কেটে ফেলি। তোমাকে এ ভাবনাগুলো ঘুণাক্ষরেও জানতে দেইনি। তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা, সেই প্রতিদ্বন্ধী কদম গাছটি যেদিন সত্যি সত্যি আমার চোখের সামনে কেটে ফেলা হলো সেদিন আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। গণিত বিভাগের সামনে জন্মানো তোমার প্রিয় দূর্বাঘাসগুলোও আজ আর নেই। আসলে ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। তুমি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে তোমার প্রিয় দুটো জিনিসও আমাকে ত্যাগ করে চলে গেলো।

তুমি যেদিন আমার কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নিয়ে গেলে সেদিনটিও ছিলো এমন বৃষ্টিস্নাত। তুমি বলেছিলে, তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। শুধু এতোটুকুই, আর কিছু নয়। সেশনজটের করালগ্রাসে আবদ্ধ আমার পক্ষে তোমাকে জীবনসাথীরূপে গ্রহণ করার সাহস ছিলোনা। আমি শুধু তোমার অশ্রুসিক্ত নয়নপানে চেয়ে ছিলাম। তুমিও শুধু অবাক বিষ্ময়ে নিষ্পলক চেয়ে ছিলে। আজ এতোবছর পর মনে হয় আমি সেদিন তোমার চোখের ভাষা সঠিকভাবে পড়তে পারিনি। তোমার সেই না বলা গভীর চাহনীর মধ্যে ছিলো একটি সুন্দর ও পবিত্র আকুতি। তোমাকে হারানোর আসন্ন যন্ত্রনায় আমি এতোটাই কাতর হয়ে গিয়েছিলাম যে তোমার সেই আকুতি আমি বুঝতে পারিনি। চিরকালের নির্বোধ আমি হয়তো তোমার চাহনীর মানে বুঝিনি কিন্তু তুমি তো পারতে মুখ ফুটে কথাটি বলতে। আমি জানি তুমি বড্ড অভিমানী। হয়তো সেই অভিমান থেকেই তুমি কিছু বলোনি।

আজ আমার বেকারত্ব ঘুচেছে। অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এসেছে। বউকে দামী কাপড়, দামী গহনা কিনে দিচ্ছি, ছেলে-মেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াচ্ছি কিন্তু এতোসব পাওয়ার মধ্যেও তোমাকে না পাওয়ার বেদনা আমাকে সবসময় কুঁকড়ে খায়। একটা কথা জানো আমার মেয়েটা না ঠিক তোমার মুখের আদল পেয়েছে। হয়তো সঙ্গমের কোন এক চূড়ান্তলগ্নে অবচেতন মনে তোমাকেই স্ত্রীরূপে কল্পনা করেছিলাম। স্ত্রী আমার সুন্দরী, সুশিক্ষিত। তবে প্রায়ই মনে হয় ব্যক্তিত্ত্বের দিক দিয়ে ও কোনভাবেই তোমার ধারেকাছেও যাবেনা। তোমার সেই অবাক অভিব্যক্তিমাখা সুন্দর চাহনী আমি ওর মধ্যে প্রায়ই খোঁজার চেষ্টা করি কিন্তু না কোনভাবেই সেই তোমাকে ওর মধ্যে খুঁজে পাইনা।

ছোট ছেলেটা পাশের ঘরে ভীষণ কাঁদছে। ছেলেটা আবার বাপের ভীষন ন্যাওটা। এবার কলম ছেড়ে তাই আমাকে পিতৃদায়িত্ব পালন করতে যেতে হবে। কাজেই তোমাকে লেখা এ চিঠি এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। আগামী বর্ষার প্রথম বাদল দিনে ক্যাম্পাসে আসার নিমন্ত্রণ দিয়ে আজকের মতো কলম রাখছি।

ইতি
তোমারই প্রেমাংশু